প্রতিবেশীর খোঁজখবরও নিতে হবে

protibesi1469619876সাম্প্রতিককালে জঙ্গি হামলা ও জঙ্গিবিরোধী অভিযান শেষে দেখা গেছে, জঙ্গিরা ভালো মানুষের বেশ নিয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ফ্ল্যাট বা বাড়ি ভাড়া নিয়েছে। অথচ কয়েক মাস পাশাপাশি বাস করার পরও প্রতিবেশীরা তাদের ভালো করে চিনতেন না। একের পর এক জঙ্গি হামলার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নিজের ও পরিবারের স্বার্থেই প্রতিবেশীর সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজখবর নেওয়ার ও জানার সময় এসেছে এখন।
গত ১ জুলাই রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার পর নিহত কয়েকজন জঙ্গির পরিচয় প্রকাশ পায়। পরে দেখা গেছে, এদের মধ্যে নিবরাস ইসলাম নামের যুবকটি ঝিনাইদহে সোনালীপাড়ায় একটি ছাত্রাবাসে চার মাস অবস্থান করেছে। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হামলার কয়েকদিন আগে নিবরাস ও অন্যরা রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ই-ব্লকে ছয় নম্বর সড়কের তিন নম্বর টেনামেন্টের এ/৬ নম্বর ফ্ল্যাটে অবস্থান করেছে। বলা হয়েছে, এই ফ্ল্যাটটি জঙ্গিদের চূড়ান্ত অপারেশনের পরিকল্পনা করার এবং অস্ত্র ও বোমা রাখার নিরাপদ আস্তানা ছিল। অথচ ওই এলাকা তথা আশপাশের লোকজন কোনো কিছুই টের পাননি।
গত ঈদুল ফিতরের জামাতের আগে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় হামলাকারীরা ওই এলাকার এক কিলোমিটারের মধ্যে একটি বাড়িতে ভাড়া ছিলো। অথচ প্রতিবেশীরা তাদের সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। সর্বশেষ গত সোমবার মধ্যরাতের পর রাজধানীর কল্যাণপুরে পাঁচ নম্বর সড়কে জাহাজ বিল্ডিং নামে পরিচিত ভবনে জঙ্গি আস্তানার খোঁজ পেয়ে সেখানে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ।
অভিযানে নয়জন জঙ্গি নিহত হয়। সেখান থেকে আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি, গ্রেনেড ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যান্য জঙ্গি আস্তানার মতো এ ক্ষেত্রেও সেই একই বিষয় সামনে এসেছে। আর তা হচ্ছে, দীর্ঘদিন এ ভবনে ভাড়া থাকলেও প্রতিবেশী তথা এলাকাবাসী তাদের  সম্পর্কে কিছুই জানতেন না।
মাত্র দুই দশক আগেও রাজধানীর চিত্র ছিল ভিন্ন। পাড়ায় বা মহল্লায় নতুন কোনো ভাড়াটিয়া এলে এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা সবার কাছে পরিচিত হয়ে উঠতেন। আর পাশাপাশি ফ্ল্যাটের বেলায় ঘনিষ্ঠতার মাত্রাটা ছিলো আরো বেশি।
পারিবারিক অনুষ্ঠান, উৎসব-পার্বনে পাশের ফ্ল্যাট তথা ভবনবাসীর দাওয়াত তো থাকতোই, সেই সঙ্গে প্রায়ই রান্না করা তরকারির বিনিময়টাও হতো । দুই দশকের ব্যবধানে দেশের সামাজিক চিত্র যেন পুরো পাল্টে গেছে। পরিবার আর ক্যারিয়ারের উন্নতির পেছনে ছুটতে গিয়ে প্রতিবেশীর খোঁজ রাখাটা আমরা ভুলে গেছি। চেনাজানা তো দূরের কথা, ভবনে নতুন কেউ এলে তার সঙ্গে সৌজন্য বিনিময়টুকুও এখন আর  হয়ে ওঠে না। আর এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সুযোগে অপরিচিতরা আমাদের বাসভবনের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। ঝুঁকিতে পড়ছে আমাদের নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের জীবন। কোনো সন্ত্রাসী হামলা কিংবা জঙ্গিবিরোধী অভিযানের পর আমাদের এলাকায় কিংবা ভবনে সন্ত্রাসীদের থাকার খবর শুনে আঁতকে উঠছি। অথচ প্রতিবেশীর খোঁজখবর নেওয়া সামাজিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
বেঁচে থাকার প্রয়োজনেই মানুষ সময়ের গতিতে নিজেকে পাল্টাতে বাধ্য হয়। এখন সময় এসেছে আমাদের পরিবর্তনের।  পরিবারের নিরাপত্তার স্বার্থেই এখন আমাদের প্রতিবেশীকে জানতে হবে।

ভবনে নতুন কেউ এলে তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও তার খোঁজখবর নিতে হবে। প্রতিবেশীর গতিবিধির ওপর প্রয়োজনে নজরদারি করতে হবে। তবে নজরদারি করার সময় কোনোভাবেই যেন প্রতিবেশী বিব্রত না হন সে দিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*