বুলেটের কাছে মাথানত করেননি বঙ্গবন্ধু

আমাদের ডেস্ক::mujib20160815003134

: ‘আমার পরিণতি যদি আলেন্দের মতোও হয় তবুও আমি মাথা নত করবো না’- চিলির প্রেসিডেন্ট বিপ্লবী নেতা সালভেদর আলেন্দে ১৯৭৩ সালে সামরিক অভ্যূত্থানে মারা যাওয়ার পর এ উক্তি করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

এর দুই বছর পার হতে না হতেই বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি ঘাতক চক্রের হাতে জীবন দিতে হয়। ঠিকই তিনি জীবন দিয়েও ঘাতকের বুলেটের কাছে মাথানত করেননি।

আজ জাতীয় শোক দিবস। মানব সভ্যতার ইতিহাসে ঘৃণ্য ও নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে এই দিনে। ঘাতক চক্র সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে।
প্রতি বছর এই দিনটিতে জাতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর শোকে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করে। দিনটি জাতীয় শোক দিবস হিসেবে এবারও পালিত হচ্ছে। এ বছর বঙ্গবন্ধুর ৪১তম শাহাদাৎ বার্ষিকী। দিনটিকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত ও শোকের কালো পতাকা শোভা পাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোয়।
টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে এবং ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে দিনভর।
‘আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব, সাহসিকতা ও নির্ভীকতায় এই ব্যক্তি হিমালয়’-কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো এভাবেই বঙ্গবন্ধুকে মুল্যায়ন করেছিলেন।
অন্য বিশ্ব নেতারাও তাকে জনগণের জন্য নিঃস্বার্থ সংগ্রামী সম্মোহনী শক্তিসম্পন্ন বিশ্ব ব্যক্তিত্ব হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ব্রিটিশ লর্ড ফেন্যার ব্রোকওয়ে বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিব জজ ওয়াশিংটন, মহাত্মা গান্ধী এবং দ্য ভ্যালেরার চেয়েও মহান নেতা’।
হাজার বছরের নির্যাতিত, শোষিত, বঞ্চিত, পরাজিত বাঙালিকে সংগঠিত করে স্বাধীনতা সংগ্রামের পথে ধাবিত করেন শেখ মুজিব। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব হয়ে ওঠেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, ভূষিত হন বঙ্গবন্ধু উপাধিতে।
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙালির স্বাধীনতা, স্বাধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলন এবং স্বাধীনতা পরবর্তী দেশ গঠনে বঙ্গবন্ধু ছিলেন নিবেদিত প্রাণ।
তার অতুলনীয় গণমুখী নেতৃত্বে বাঙালি জাতি দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও ৫২, ৬২, ৬৬, ৬৯, ৭০-এর চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ১৯৭১-এ এসে উপনীত হয়। পাকিস্তানি সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলনের এক পর্যায়ে একাত্তরের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণে জনগণের ভোটে নির্বাচিত নেতা বঙ্গবন্ধু বাঙালিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার দিক-নির্দেশনা দেন। ভাষণে বাঙালিকে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।
বঙ্গবন্ধুর এ ডাকে সাড়া দিয়ে দেশকে স্বাধীন করতে প্রস্তুত হয় বাঙালি। ২৬ মার্চ তার নির্দেশেই মুক্তিকামী মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের নাম, অভ্যূদয় ঘটে একটি স্বাধীন জাতিরও। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাঙালি অধিষ্ঠিত করে তাদের জাতির পিতার আসনে।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরদিন ১৬ আগস্ট ভারতীয় বেতার ‘আকাশ বাণী’ তাদের সংবাদ পর্যালোচনা অনুষ্ঠানে বলে … ‘যিশু মারা গেছেন। এখন লক্ষ লক্ষ লোক ক্রুশ ধারণ করে তাকে স্মরণ করছে। মূলত একদিন মুজিবই হবেন যিশুর মতো’। আজকের বাস্তবতায় আকাশ বাণীর সেই পর্যালোচনা বঙ্গবন্ধুর যথার্থ মূল্যায়ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতির পথপ্রদর্শক হিসেবেই বঙ্গবন্ধু বাঙালির হূদয়ে স্থান করে নিয়েছেন।
লন্ডন থেকে প্রকাশিত ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার সংবাদে বলা হয় … ‘বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ লোক শেখ মুজিবের জঘন্য হত্যাকাণ্ডকে অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করবে’।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতি-ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র ভুলুণ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার চেতনা ও মুল্যবোধকে পদদলিত করে উল্টো পথে সেই পাকিস্তানি ভাবধারার দিকে ধাবিত হয় বাংলাদেশ। আবারও বাঙালির ঘাড়ে জেঁকে বসে সামরিক স্বৈরশাসন।
স্বাধীনতার পর জাতির অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন। তাকে হত্যা করার পর সেসব পদক্ষেপগুলোকেও বন্ধ করে দেওয়া হয়। দেশে হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু হয়ে যায়।
ষড়যন্ত্র, পাল্টা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে একের পর এক সামরিক স্বৈরশাসনের পালাবদল হতে থাকে। একই সঙ্গে সামরিক স্বৈরশাসকদের ছত্রছায়ায় দেশে স্বাধীনতাবিরোধী পরাজিত গোষ্ঠী, উগ্র সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী জঙ্গি গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে।
স্বাধীনতার পর দেশ পরিচালনায় বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী পদক্ষেপে বাংলাদেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে থাকে। বঙ্গবন্ধুর এই সফলতা ও উন্নতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার গতি বুঝতে পেরেই স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা ঠাণ্ডা মাথায় তাকে হত্যা করে।
‘কোনো কোনো মৃত্যু আছে ফিনিক্স পাখির পালকের মতো হালকা, আবার কোনো কোনো মৃত্যু আছে থাই পাহাড়ের চেয়েও ভারি’- চীনের বিপ্লবী নেতা মাও সেতুং এর বিখ্যাত উক্তিটিও যথার্থ। বঙ্গবন্ধুর মুত্যুতে বাঙালি জাতির যে ক্ষতি হয়েছে, তা পাহাড়ের চেয়েও ভারি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*