মোবাইল কোর্ট বন্ধ হলে বাড়বে অপরাধ পাশাপাশি মানুষ খাবে বিষ (মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সু-দৃষ্টি কামনা)

আমাদের ডেস্ক::
দেশের প্রচলিত মোবাইল কোর্ট আইন বন্ধ হলে দেশের একটি বিশেষ গোষ্ঠী লাভবান হতে পারে। তবে এটি বন্ধ হলে দেশের বিভিন্ন সেক্টরে অপরাধ প্রবণতা ব্যপকহারে বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি দেশের ভ্যান চালক থেকে শুরু করে মন্ত্রী এমপিসহ সর্বস্তরের মানুষ বাজারের ক্রয়কৃত অনেক ভেজাল খাদ্য দ্রব্য থেকে বিষ খাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে বলে সমাজ বিশ্লেষক ও সমাজ সচেতনমনারা আগামীতে মহাআতংকে ভুগছে। আসন্ন পবিত্র রমজান মাসেও এর প্রভাব ব্যপকহাবে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যে এই সুযোগকে পুজি করে মুনাফ অর্জনে বিভিন্ন প্রকার পাঁয়তারা করছেন। আর প্রতারিত হওয়ার পাশাপাশি অনেক ক্ষতিগ্রস্থও হবে সর্ব শ্রেণি-পেশার মানুষ।
মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করার কারণে বিগত সময়ে মানুষ অনেকটাই সচেতন হয়েছে এবং বিভিন্ন অপরাধ অনেকাংশে কমে এসেছে। মোবাইল কোর্ট বিআরটিএ ও পাসপোর্ট অফিসকে দালাল মুক্ত করার সহযোগীতা, ট্রাকের বাম্পার অপসারণ, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রীর জেলার পন্যে বাধ্যতামূলক চর্টের ব্যবহার নিশ্চিত করণে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, বাল্যবিবাহ, ইভটিজিং বা যৌন হয়রানী, মাদক নিয়ন্ত্রণ, সরকারি সম্পত্তি, খাসজমি জবরদখল, রাস্তার গাছ কর্তন, অবৈধ বালু উত্তোলন, হাটবাজারের জমি দখল, পাবলিক পরীক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, খাদ্য ভেজাল প্রতিকার, ভোক্তা অধিকার রক্ষা, জুয়া, সড়ক নিরাপত্তা জোরদারকরণসহ মোবাইল কোর্টের আওতায় বিভিন্ন কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন নওগাঁ জেলা প্রশাসনসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। এর ফলে দেশের বিভিন্ন মহলে কাছে প্রশংসাও কুড়িয়েছেন। আইনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাশীলতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়াও সারা দেশে প্রায় ৯ লাখ মামলা মোবাইল কোর্টেই নিষ্পত্তি হয়েছে। ৭ বছরে ২০৮ কোটি টাকারও বেশি জরিমানা আদায় হয়েছে বৃদ্ধি পেয়েছে সরকারের রাজস্ব। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে গত সাত বছরে বিভিন্ন প্রকৃতির আট লক্ষাধিক অভিযোগের নিষ্পত্তি করা হয়েছে। প্রায় ৩ লাখ ৬২টি কোর্ট পরিচালনা করা হয় এ সময়ে। এছাড়া প্রায় ৮ লাখ ২০ হাজার ৭৩১টি নিষ্পত্তিকৃত অভিযোগের সূত্রে ২০৮ কোটি ৩৭ লাখ ৫২ হাজার ৪১২ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।
২০০৯ সালে মোবাইল কোর্ট আইন প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তীতে সর্বশেষ ২০১৫ সালে সংশোধনের মাধ্যমে প্রচলিত ১০৯টি আইনের কিছু ধারার অভিযোগ আমলে নিয়ে সে অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের। নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ আলাদা করার প্রেক্ষাপটে নির্বাহী কর্তৃত্বের মাধ্যমে ছোটখাট সামাজিক অপরাধ দমন বা নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল এই আইন প্রণয়নের লক্ষ্য। এছাড়া বিচারিক আদালতে মামলার ভার কমাতে সহায়তা করতে পারবে বলেও এই আইনটি করার স্বপক্ষে মতামত দেয় সরকার।
২০০৯ সালে নিম্ন আদালতে বিচারাধীন মামলা ছিল আট লাখ। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে কমবেশি ৩০ লাখ। বিপুলসংখ্যক এই মামলার বিচার সম্পন্ন করার মতো বিচারক ও অবকাঠামোর সংকটের কথা একাধিকবার উচ্চারিত হয়েছে। খাদ্য পণ্যে ভেজাল প্রতিরোধ, পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ কিংবা ইভটিজিং নিয়ন্ত্রণে মোবাইল কোর্ট প্রশংসা কুড়িয়েছে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদেও মোবাইল কোর্ট অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। এছাড়াও গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনয়নে ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করেছে। গত বছর থেকে ফরমালিন মুক্তভাবে আম বাজারজাত করার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে মোবাইল কোর্ট।
খাদ্যে ভেজালরোধ, মাদকের অপব্যবহার রোধ, ইভটিজিং প্রতিরোধ, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, পরিবেশ রক্ষা, অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ ইত্যাদি সামাজিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে মোবাইল কোর্ট ইতিমধ্যে একটি জনপ্রিয় এবং কার্যকর আইন হিসেবে জনগণের মাঝে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মোবাইলকোর্ট আইন-২০০৯ চালু হওয়ার পর হতেই অসংখ্য প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে ভূমিদস্যুতা, বেপরোয়া দূষণ অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, ড্রেজার চালানো বিষয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থাগ্রহণএবং সরকারি সম্পদ ও জনস্বার্থ রক্ষায় অবিচল থেকে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে আসছেন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটগণ। ছোট-খাট অপরাধই বড় অপরাধের জন্ম দেয়। ছোট-খাট অপরাধ দমন না করা হলে সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচলনা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এ কারণেই আইন প্রণেতাগণ দেশের বাস্তব অবস্থা চিন্তা-ভাবনা ও পর্যালোচনা করেই মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ প্রনয়ণ করেছেন।
জেলা প্রশাসন, উপজেলাসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাৎক্ষনিক আইনী সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি অনেক কর্মকর্তা এয়ারপোর্ট, ডেসকো, ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন, বন্দর, সিডিএ, রাজউক, র‌্যাব, ডিএমপি ইত্যাদিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে প্রেষণে কর্মরত থেকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ও সরকারের স্বার্থ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
বিশ্বের প্রত্যেকটি জাতি তার নিজস্ব সংস্কৃতি অনুযায়ী আইন তৈরী করে থাকে। যুগ যুগ ধরে অপরাধের বিচার চলে আসছে জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। যে প্রক্রিয়াটি অনেক বেশী সময় সাপেক্ষ ও জটিলতাপূর্ণ। এ দুই ধরণের অপরাধের বাইরে একটি তৃতীয় মাত্রার অপরাধ ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে আমাদের সমাজে। তা হলো সামাজিক অপরাধ (সোস্যাল ক্রাইম)। আজ তাই ইভটিজিং (যা কিনা ধর্ষন, এসিড নিক্ষেপ বা আত্বহত্যার মত মারাত্বক পরিণতি ডেকে আনে), মাদকাসক্তি, খাদ্য ও ঔষধের মত অতি সংবেদনশীল দ্রব্যে ভেজাল দেয়া, সামাজিক নিপীড়ণ ও জননিরাপত্তা, পরিবেশ দূষণসহ অজস্র সামাজিক অপরাধ বেপরোয়াভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে।
ঠিক এমনি এক অস্থির সময়ে ভ্রাম্যমান আদালত হয়ে ওঠে জনগণের কাছে আস্থা এবং সুবিচারের ভরসার জায়গা ও প্রতীক। অতিষ্ট জনগন খুঁজে পায় স্বস্তির নীড়। আজ বিমান বন্দরে প্রবাসীরা কোন অবিচারের শিকার হলে সাথে সাথে পেয়ে যায় ম্যজিস্ট্রেটের কাছে ‘ন্যয্য বিচার’, আমাদের কোন কন্যা সিলিং ফ্যানে ঝোলার আগেই অনেক ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমান আদালতের ভয়ে এলাকার বখাটেরা গুটিয়ে নেয় তাদের মোক্ষম পৌরুষ। কালো ওষুধ ব্যবসায়ীরা কিংবা অবৈধ প্রিজারভেটিভ ব্যবসায়ীরা আজ তটস্থ আইনী ভীতিতে।বাংলাদেশে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী খাদ্য দ্রব্যে বিষক্রিয়া সৃষ্টিকারী রাসায়নিক দ্রব্য, কীটনাশক, বালাইনাশক ব্যবহার করছেন। এছাড়াও মূল্য বৃদ্ধি ও পচন রোধের জন্য রঞ্জক পদার্থ, সুগন্ধীসহ বিভিন্ন প্রাণঘাতী রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করছেন।
আমে যে ভাবে ফরমালিন ব্যবহার হতো তা সারাদেশের ফলপ্রেমী মানুষ গ্রহণ করে তাতে ফরমালিনের ব্যবহার মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ প্রয়োগ করে কাঁচা ও অপুষ্ট আম গাছ থেকে নামানো ও পরিবহন কাজ প্রতিহত করে। একইসাথে ফরমালিনযুক্ত আম পেলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে সেগুলো ধ্বংস করা হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও জায়গায় নিরাপদ খাদ্য আইনের ২৩ ধারা প্রয়োগ এবং মোবাইল কোর্টের অন্যান্য মাধ্যমে নানা ধরনের অপরাধ প্রতিহত করা হয়।
বিভ্রান্তিকর, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য প্রদানের মাধ্যমে জনসাধারনকে বিভ্রান্ত করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় কিছু অসাধু চক্র। নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ এর ৩২(খ) ধারার প্রয়োগের মাধ্যমে এই ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে খুবই কার্যকরী সহায়ক ভূমিকা পালন করে মোবাইল কোর্ট। এমতাবস্থায়, জনসাধারণের বিশুদ্ধ খাদ্য প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণ তথা একটি স্বাস্থ্যবান জাতি গড়ার লক্ষ্যে ভেজাল খাদ্যের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার জন্য নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ এর সফল ও সুষ্ঠু প্রয়োগের জন্য মোবাইল কোর্ট সাধারণ জনগনের মাঝে ব্যপক আস্থা ফিরিয়ে এনেছে। দেশে ইলিশের প্রাচুর্য্যের কারণ হচ্ছে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা পরিচালিত ভ্রাম্যমান আদালত।
মোবাইল কোর্ট অবশ্যই উচ্চ আদালতের কাছে দায়বদ্ধ। সব ধরণের ছোট-খাটো মামলা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে বিচার করা হলে নিম্ন আদালত মামলার ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে যাবে। এবছরের গত ১৭ জুলাই মাননীয় আইনমন্ত্রী সংসদকে জানিয়েছিলেন, “২০১৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট ৩১ লাখ ৯ হাজার ৯’শ ৬৭টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।” অন্যদিকে গত ২৭ মে রাজধানীর ইস্কাটন রোডে অবস্থিত বিয়াম ফাউন্ডেশন অডিটোরিয়ামে মোবাইল কোর্ট পরিচালনাঃ জননিরাপত্তা ও সামাজিক অপরাধ নিয়ন্ত্রন শীর্ষক কর্মশালার আয়োজন করে মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ জানিয়েছে- “গত ২০১৫ সালে এক বছরে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭’শ ৫৪ জনকে কারাদন্ড প্রদান করা হয়েছে এবং ৩৭ কোটি ৩৭ লাখ ৮৮ হাজার ২’শ ৪৬ টাকা আদায় করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। ৫৭ হাজার ১’শ ৫৭টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯’শ ২৭ টি মামলার নিষ্পত্তি করা হয়।” অর্থাৎ মোবাইল কোর্ট না থাকলে এবং আইন শৃংখলা পরিস্থিতি বর্তমান অবস্থায় রাখতে আরো প্রায় এক লাখ ৩৭ হাজার মামলা নিম্ন আদলতকে পরিচালনা করতে হতো। এতে নিম্ন আদালতের কি অবস্থা হতো? নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এর পরিবর্তে বিচারিক ম্যাজিস্ত্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা জন ভোগান্তি দ্বিগুন বা তিনগুন হবে অচিরেই। নিয়মিত আদালতে এ মামলা অচিরেই ছাড়িয়ে যাবে অর্ধ কোটির কাতারে।
বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটদের আনান্য থানায় উপজেলায় অবস্থান করে সার্বক্ষণিক রাত বিরাত বিচারিক সেবা দেয়া অত্যন্ত দুরুহ এবং বাস্তবায়ন যোগ্য নয়। যেটা এখন করেছেন ইউ এন ও , এসিল্যান্ড, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। কারণ তারা সেখানে সার্বক্ষণিক অবস্থান করেন।
ইতোমধ্যেই বিভিন্ন জেলা হতে প্রাপ্ত রিপোর্টে বাল্য বিবাহ, ইভটিজিং, বিভিন্ন প্রকারের ভেজাল, সরকারী জমি দখল ও সামজিক অপরাধসমূহের খবরা খবর পাওয়া যাচ্ছে। এখানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ নিরব ভূমিকা পালন করা ছাড়া তাদের আর গন্তব্য কিছুই নেই। আর ইউ এন ও , এসিল্যান্ড, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা জনমানুষের সাথে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তারা যে সকল সামাজিক ছোট অপরাধের তথ্য পেত তা বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেরা আর পাবে না। ফলে অনেক অপরাধ আদালতের গোচরেই আসবে না। যার জন্য দেশের উনয়ন অগ্রগতি মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। এসডিজি বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে যাবে। সামাজিক কাঠামো ভেঙ্গে পড়বে। বিশৃঙ্খল সমাজ ব্যবস্থার সৃষ্টি হতে পারে।
মোবাইল কোর্ট একটি অপরাধ প্রতিরোধকল্পে গৃহীত ব্যবস্থা। সরকার দেশের এই মামলা জট কমাতে শুধু এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট এর মাধ্যমে পরিচালিত মোবাইল কোর্টকেই গুরুত্ব দিচ্ছে না। গ্রাম আদালত আইন, ২০০৬ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত গ্রাম আদালতকেও কার্যকর করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। দেশে বর্তমানে তিন ধরণের বিচার ব্যবস্থা চালু রয়েছে। একটি নিয়মিত আদালত বা জুডিশিয়াল বিচার ব্যবস্থা, আরেকটি প্রশাসন ক্যাডারের সদস্যদের মাধ্যমে ঘটনাস্থলে অপরাধ আমলে গ্রহণ করে দোষ স্বীকারের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক বিচারের ব্যবস্থা। সর্বশেষ জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে ছোট-খাট অপরাধের বিচার করা। এর উদ্দেশ্য মূলত একটিই। আর তা হলো- নিম্ন আদালতকে সহায়তা করা। বলাই বাহুল্য যে, এর প্রতিটি মামলার রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করা যায়। ধাপ পেরিয়ে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরাই এই আপীল শুনে থাকেন। আদালতকে সহায়তার এ বিষয়টি শুধু এদেশেই নয়। খোদ বৃটেনে ‘লে ম্যাজিস্ট্রেট’ নিয়োগ করা হয়। অনেকেই মনে করেন বিচারক হতে গেলে আইনের ছাত্র হতে হয়। তারা বৃটেনের উদাহরণ দেখতে পারেন। বৃটেনের ‘লে ম্যাজিস্ট্রেট’ হতে গেলে আইন পড়তেই হবে এরকম কোন বাধ্য বাধকতা ‘লে ম্যাজিস্ট্রেট’রা ছোট-খাটো অপরাধের বিচার করে থাকেন। যেমন, অ্যাসল্ট, মটর গাড়ি সংক্রান্ত অপরাধ, চুরি ও চুরির মালামাল বহনের জন্য তারা শাস্তি দিতে পারেন। এক্ষেত্রে জরিমানা, কমিউনিটি সার্ভিস প্রদানের আদেশ এবং ক্ষেত্র বিশেষে ৬ মাস থেকে এক বছরের কারাদন্ড দিতে পারেন। এক্ষেত্রে তো কেউ বিচার বিভাগের সম্মাণ ক্ষুন্ন হওয়ার কথা বলেন না। আসলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাস্তবতার নিরিখে কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। তা অন্য দেশের ব্যবস্থার সঙ্গে মেলানো যায় না। মাননীয় সংসদ সদস্যদের সদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনার আলোকে জন্ম নেয়া এই মোবাইল কোর্টের প্রত্যাশাও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটগণ ইতিমধ্যে পূরণ করতে সমর্থ হয়েছে। দেশের মানুষ আজ ভেজালমুক্ত খাদ্যের নিশ্চয়তা পাচ্ছেন। মোবাইল কোর্টের তৎপরতার কারণেই এবছর কোন ফলমূলে তেমন ফরমালিন পাওয়া যায়নি। ইভটিজিং এর মহমারি অনেকটা দূর হয়েছে। সুষ্ঠুভাবে বিভিন্ন পরীক্ষা নেয়া সম্ভব হচ্ছে। মোদ্দাকথা, যেসব ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্টকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে- তার সবগুলো ক্ষেত্রেই সাফল্য এনেছে মোবাইল কোর্ট। আর এ কারণে দেশবাসীর মাঝে মোবাইল কোর্টের জনপ্রিয়তাও আকাশচুন্বী। মোবাইল কোর্ট এর কার্যক্রম নিয়ে খবরের পাতায় সংবাদ ছাপা হয় প্রায় সময়ই।
ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের প্রশাসনিক ও বিচারিক কাঠামো অনেকটা একই। ভারতের বিচার বিভাগ স্বাধীন কিন্তু সেখানকার জেলা শাসক জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। যেমন : আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জননিরাপত্তা বিধান এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষায় ঞযব ঈড়ফব ড়ভ ঈৎরসরহধষ চৎড়পবফঁৎব, ১৮৯৮-এর ঢ়ৎবাবহঃরাব ধারাগুলো প্রয়োগ করেন এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে জেলা পুলিশকে নিয়ন্ত্রণ করেন।
পাকিস্তানে সরকার প্রশাসনিক সংস্কারের নামে ২০০১ সালে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ আলাদা করে। মাঠপর্যায়ের জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার বিলুপ্ত করে পদের প্রবর্তন করা হয়। এই ব্যবস্থায় তারা এতটাই প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় যে, ২০১৩ সালে ১৮৯৮ সংশোধন করে পুনরায় জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং বিভাগীয় কমিশনার পদ প্রবর্তন করে।
জেলা প্রশাসকের জেলার প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে অন্যান্য সব বিভাগকে সমন্বয় সাধন করা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জননিরাপত্তা বিধান ও অপরাধ প্রতিরোধে বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োজন। ম্যাজিস্ট্রেসি না থাকলে সমন্বয় যে সম্ভব নয়, তার প্রমাণ তো ভারত ও পাকিস্তান। ম্যাজিস্ট্রেসি ছাড়াই সমন্বয় সম্ভব হলে পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তন করত না।
বিচারিক এই ক্ষমতার মাধ্যমে অপরাপর বিভাগের সঙ্গে জেলা প্রশাসকের যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে। প্রশাসনিকভাবেও যোগসূত্র আছে তা অত্যন্ত ক্ষীণ। যেমন : জেলা প্রশাসক জেলায় সকল কমিটির সভাপতি। সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় প্রধান ওই কমিটির সদস্য সচিব। জেলায় জেলা প্রশাসকই কেন্দ্রীয় সরকারেরএকমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে জবাবদিহিতা করে থাকেন।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের এই ক্ষমতা জেলা ম্যাজিস্ট্র্রেটের না থাকলে সরকারি কাজে বাধা দান করলে তাৎক্ষণিক প্রতিকার দিতে পারবেন না, অবৈধভাবে খাল ভরাট করলে তিনি প্রতিরোধ করতে পারবেন না। চোরাচালান প্রতিরোধ করতে পারবেন না। ব্যবসায়ীদের বে-আইনি সিন্ডিকেট দমন করতে পারবেন না, জাটকা ইলিশের বাজারজাত ঠেকাতে পারবেন না, অবৈধভাবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ চুরি ও তার ব্যবহার রোধ করতে পারবেন না, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে পারবেন না, বিশেষ পরিস্থিতিতে গড়ন নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না, পরিবেশ রক্ষা করতে পারবেন না, প্রটোকল ব্যবস্থাপনায় আইনগত কর্তৃত্ব হারাবেন, সরকারি প্রয়োজনে গাড়ি রিকুইজিশন করতে পারবেন না। এ রকম আরো হাজারো কাজে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আইনগত এখতিয়ার হারাবেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জননিরাপত্তা বিধান, অপরাধ প্রতিরোধ জেলা প্রশাসকের সাধারণ দায়িত্ব। ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা ছাড়া তিনি কীভাবে অপরাধ প্রতিরোধ করবেন। কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কীভাবে পুলিশকে নির্দেশ দেবেন। জরিমানা ও কারাদণ্ড বলতেই যদি বিচার বিভাগের এখতিয়ারকে বোঝায় তাহলে নির্বাহী বিভাগের কার্যপরিধির পুনর্বিন্যাস করতে হবে।
রেলওয়ে আইন ১৮৯০-এর ১২৯ ধারা এবং ১৩০ ক ধারায় রেলওয়ের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মচারীকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার ও তল্লাশি করার ক্ষমতা দেওয়া আছে। মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩-এর ১৫৯, ১৬০ ও ১৬১ ধারায় পুলিশ কর্মকর্তাকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া আছে। এ ছাড়া মেট্রোপলিটন আইনে পুলিশ কমিশনারের বিচারিক ক্ষমতাতে নির্বাচনকালীন প্রিসাইডিং কর্মকর্তার ম্যাজিস্ট্রেসি, ১৯০৮-এ সাব-রেজিস্ট্রারের বিচারিক ক্ষমতা, ট্যাক্স আইনে ট্যাক্স কর্মকর্তাদের দণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা রহিত করতে হবে।
সে ক্ষেত্রে সাবরেজিস্টারকে হতে হবে বিচারিক হাকিম। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে থাকতে হবে বিচারিক হাকিম, ট্যাক্স ও রেল বিভাগে বিচারিক হাকিম পদায়ন করতে হবে, বিদ্যুৎ, পরিবেশ, ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশন, ভোক্তা অধিকার, সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর, র‌্যাবেও বিচারিক হাকিম নিয়োগ দিতে হবে। সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা পরিচালনার জন্য শিক্ষা বিভাগেও বিচারিক হাকিম থাকতে হবে, নির্বাহী এসব প্রতিষ্ঠানে বিচারিক হাকিম পদায়ন করা একটি অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয় মর্মে সুশিল সমাজের কাছে প্রতিয়মান হয়।
ক্ষমতার নিরঙ্কুশ বিভাজন সম্ভব নয় বিধায় আন্ত:বিভাগ সমন্বয়ের স্বার্থে সরকারের অনেক বিভাগকে এ ধরনের ক্ষমতা দেওয়া আছে। আর তা ছাড়া জেলা প্রশাসক তো ১৮৯৮-এর ১০ (১) ধারা অনুসারে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। মাঠপর্যায়ে কাজের মনিটরিং, সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা গ্রহণ, অবাধ নির্বাচন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, মাদক চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ, খাসজমি রক্ষা, সার ও খাদ্য সরবরাহ ঠিক রাখা, নারী নির্যাতনসহ ইভটিজিং প্রতিরোধ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ, ন্যায্যমূল্যে ভেজালমুক্ত প্রোডাক্ট ও সেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিতকরণ, জুয়া প্রতিরোধ, মৎস্যসম্পদ রক্ষা, পরিকল্পিত নগরায়ন, মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ, সরকারি জমি রক্ষা, নোটবই প্রতিরোধ, ভেজার ওষুধ ও ভুয়া চিকিৎসক প্রতিরোধ, ওজনে কম দেওয়া প্রতিরোধ, সরকারি প্রয়োজনে ভূমি হুকুম দখল, নিরাপদ পানি সরবরাহ, ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ, এসিড নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান প্রতিরোধ, সুষ্ঠু সার ব্যবস্থাপনা, কৃষিজমি রক্ষা, শিশুশ্রম প্রতিরোধ, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ, রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন, জনগণের সেবক সরকারি অফিসের কর্মকর্তারা চার্টার অনুযায়ী সেবা দিতে সঠিক দায়িত্ব পালন করছেন কি-না তার দায়বদ্ধতা, অসাধু ব্যক্তি সরকারি কাজে বাধা দিচ্ছে কি-না, সুষ্ঠু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অন্য কেউ অনিয়ম করলেও তার জন্য দায়ী থাকা ইত্যাদি নির্বাহী বিভাগের কাজের জন্য প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে বিচারিক ক্ষমতা থাকা বাঞ্ছনীয়। জনস্বার্থেই প্রশাসকদের এই ক্ষমতায়ন বিশেষ প্রয়োজন।
এ ছাড়া আমলাদের হাতে আইন প্রয়োগের এই সুযোগ না থাকলে ভবিষ্যতে আইনের খসড়া প্রণয়ন, আইন অনুসারে মন্ত্রণালয় বা বিভাগগুলোর কর্মকাণ্ড পরিচালনায়ও সমস্যা হবে। তা ছাড়া ম্যাজিস্ট্রেসির সঙ্গে সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলেই সিটি করপোরেশনগুলোতে ম্যাজিস্ট্রেট পদায়ন করা হয়। আর যে জেলা প্রশাসক জেলায় সরকারের হাজার, হাজার একর সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা ও বিলিবণ্টন করেন ম্যাজিস্ট্রেসি ছাড়া সেই জেলা প্রশাসকের পদ অবাস্তব এবং অকল্পনীয় মর্মে সমাজ বিশ্লেষকদের ধারনা।
বিচারিক ক্ষমতা ছাড়া জেলা প্রশাসক বা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের পদ অবাস্তব। বিচার বিভাগ পৃথককরণের পর মাঠ প্রশাসনে যে অস্থিরতা, সমন্বয়হীনতার কথা পত্রিকায় যতবার এসেছে, পৃথককরণের আগে এ রকম সমন্বয়হীনতার কথা শোনা যায়নি। বিচারিক এই ক্ষমতা না থাকার কারণে সরকারি সম্পদ রক্ষা, সরকারি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে গিয়ে মাঠ প্রশাসন বারবার লাঞ্চিত হয়েছেন।
ডিজিটাল বাংলাদেশ স্বপ্নের বাস্তবায়নে জনগণের দোরগোড়ায় সেবা স্লোগানটি আসলে এখন আর স্লোগান নয় । অন্যান্য সকল নাগরিক সেবার পাশাপাশি বিচার প্রার্থীর ক্ষেত্রেও এক অনন্য ভরসা হিসেবে পাশে দাঁড়িয়েছে সরকারের নির্বাহী বিভাগের পরিচালিত বিচারিক সেবা। অন্যায়, অপরাধ বা অসঙ্গতির ক্ষেত্রে বিচার আসলে কোন ক্ষমতা প্রয়োগের বহিঃপ্রকাশ নয় । এটি আসলে সেবা। অন্তত মোবাইল কোর্টের ক্ষেত্রে তো তাই। ২০০৯ সালে পাসকৃত মোবাইল কোর্ট আইনের মাধ্যমে স্বীকৃতি প্রাপ্ত এইদ্রুত সেবাপ্রাপ্তির এ অনুসরণীয় কোর্ট টি আসলে জনগনের দোরগোড়ায় বিচার বা
বিচার প্রক্রিয়ার এই রূপ নিয়ে বিভিন্ন স্টেক হোল্ডারের রয়েছে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া । এটি নিয়ে রয়েছে বিভিন্ন মতাদর্শ। তাই মোবাইল কোর্ট সংক্রান্ত নানা ইস্যু নিয়ে গণমাধ্যমের জরিপ নতুন নয়। সকল জরীপেই মোবাইল কোর্টের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ।
প্রশ্ন হচ্ছে মোবাইল কোর্টের পক্ষে সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অবস্থান এবং সমর্থন কেন? এর উত্তর খোঁজা খুব কঠিন কাজ নয়। গত কয়েক বছর যাবত নানা সামাজিক সমস্যা মোকাবেলায় মোবাইল কোর্টের অব্যাহত সাফল্য, মোবাইল কোর্টের প্রতি সাধারণ মানুষের এই সমর্থনের মূল কারণ। প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসুত্রিতা ও ব্যয়বাহুল্যের বিপরীতে বিনা খরচা ও বিনা হয়রানিতে তাৎক্ষনিক বিচার প্রাপ্তি মোবাইল কোর্টের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং জনসাধারণদের গ্রহণযোগ্য মাইলফলক।
মোবাইল কোর্ট আসলে পরিচালনা করেন কারা ? মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯ অনুযায়ী সরকারের নির্বাহী বিভাগে নিয়োগপ্রাপ্ত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটবৃন্দ ( নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ), সরকারী আদেশবলে অথবা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ( জেলা প্রশাসক ) এর ডেলিগেশনের মাধ্যমে এই মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় ক্ষমতা প্রাপ্ত ।
সরকার তার নীতি ও আর্দশের বাস্তবায়ন/ বাস্তবায়নের পথে বাধা অপসারনের ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট আইন প্রয়োগ করে। যেমন : নতুন কোন রাস্তা করা হবে অবৈধ্য স্থাপনা আছে উচ্ছেদের কাজটি এর মাধ্যমে করা হয়। তেমনি জাটকা ইলিশ ধরা নিষেধ এ কাজটি সরকার মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে। এটা সেই অর্থে প্রচলিত কোর্ট না। মোবাইল কোর্টের তফশীল দেখলেই বোঝা যায় সরকারের নীতি ও আর্দশ বাস্তবায়নে এ কোর্ট কতটা সংশ্লিষ্ট।
অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ স্যার মানুষকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে ‘আলোকিত মানুষ চাই’ এই স্লোগান নিয়ে চালু করেন ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি। যা আজ বাংলাদেশের অনন্য দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছে। যা মানুষের দ্বারে দ্বারে বিতরণ করে চলেছেন জ্ঞানের আলো। তেমনি ন্যায় বিচারের ঝাণ্ডা হাতে করে এদেশে সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে কাজ করে চলেছে মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত। গণমানুষ সংশ্লিষ্টতা এদেশে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মূল শক্তি সে কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক পরিচালিত মোবাইল কোর্ট বন্ধ হলে নিম্ন বর্ণিত সমস্যাগুলোর উদ্ভব হবেঃ
১. ভেজাল মিশ্রিত খাদ্যে বাজার সয়লাব হবে। ২. বাজার সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। ৩. মদ, জুয়া, মাদকে দেশ ভরে যাবে। ৪. পরিবহন খাতে নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে। ৫. লঞ্চডুবি, নৌকাডুবি বেড়ে যাবে। ৫. নিষিদ্ধ নোট বই পড়ে শিক্ষার্থীরা মেধাহীন হয়ে পড়বে। ৬. পাবলিক পরীক্ষায় নকল বেড়ে যাবে। ৭. ভূয়া ডাক্তার দের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাবে। ৮. অবৈধ ঔষধ বাজার দখল করবে। ৯. ওজনে কম দেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যাবে। ১০. হোটেল -রেস্টুরেন্ট এর মান বজায় থাকবেনা বা সাধারণ মানুষ প্রতারিত হবে। ১১. ভেজাল দুধ বিক্রয় হবে নির্ভয়ে। ১২. অবৈধভাবে এসিডের ব্যবহার বেড়ে যাবে। ১৩. জাটকা ইলিশ নিধন ঠেকানো যাবেনা। ১৪. সামনে পবিত্র রমজান মাস, এসময় পন্যের মান ও বাজার মূল্য নিয়ন্ত্রণ এ রাখতে না পারলে সরকারের জনপ্রিয়তা থাকবেনা। ১৫. সর্বোপরি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রজাদের সার্থ রক্ষা করা যাবে না।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার জন্য সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন একটি অন্যতম নির্দেশক। উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ কর্তৃক মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ব্যতিত স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকান্ড সঠিকভাবে ও নিরপেক্ষভাবে তদারকি এবং বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্থ হবে। এর ফলে সরকারি সেবা প্রত্যাশী নাগরিকরা চরম ভোগান্তির সম্মুখীন হন।
নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট দ্বারা মোবাইল কোর্ট নিষিদ্ধ হওয়ার প্রভাব ইতোমধ্যেই তৃণমূলে পড়তে শুরু করেছে। মাঠ প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে বাল্যবিবাহ, ইভটিজিং, মাদক, বালুউত্তোলন বা খাস জমি দখলের একাধিক ঘটনা জানার পরেও তারা কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন নি। এমন পরিস্থিতি বিরাজ করলে মাঠ প্রশাসনের শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সমাজ বিশ্লেষক, সমাজ সচেতনমনারাসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতি মানবিক আবেদন রয়েছে। যাতে করে নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটের দ্বারা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা বন্ধ না হয়। কারণ এটি বন্ধ হলে দেশের অপরাধ প্রবণ একশ্রেণি মানুষ হয়তোবা উপকৃত বা নানাভাবে লাভবান হবে। এতে করে এক দিকে সরকারের ভাবমূর্তি যেহারে ক্ষুন্ন হবে অন্য দিকে জনভোগান্তিসহ আইনের শাসনের প্রতি আস্তা হারাবে সাধারণ জনগণ। এছাড়াও এর ফলে আগামী প্রজন্মের সোনালী স্বপ্ন নানাভাবে ধুলিষ্যাত হওয়ার মহাআতংক অনেক মানুষের মাঝে বিরাজ করছে। সুন্দর আগামীর জন্য সমাজ তথা দেশ উন্নয়নের মহাসড়কের মজবুত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকা বিশ্ব নন্দিত ও দেশ উন্নয়নের কান্ডারী মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর নিকট আগামী প্রজন্ম ও তাদের অভিভাবকগণের আকুল আবেদন। নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটের দ্বারা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা যেন বন্ধ না হয় সেই শুভ সংবাদের অপেক্ষায় তারা প্রহর গুনছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*