জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও বিজয়ের বাংলাদেশ

লায়ন ডা. বরুণ কুমার আচার্য বলাই

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বাংলাদেশ এক অবিচ্ছেদ্য নাম। ইতিহাস থেকে এ নাম কখনো মুছে যাবে না। কর্মের মাঝে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অমর হয়ে থাকবেন বাঙালির ইতিহাসে হাজার-লক্ষ-কোটি বছর। বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এই নামে সমগ্র বিশ্বব্যাপী পরিচিত। সম্প্রতি ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণটিকে ইউনেসকো কর্তৃক স্বীকৃতি প্রদান করায় বিশ্বব্যাপী আবারও আলোচিত হলো বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশের মহান স্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বিজয়ের বাংলাদেশ প্রবন্ধ পাঠের মাধ্যমে ২০১৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি সম্মান ও তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করছি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের পথিকৃত হিসেবে মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সংগ্রাম করে বাংলার মাটি ও মানুষের সাথে আজো তিনি মিশে আছেন। স্বাধীন বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর অমর কীর্তি। তাই বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এক অবিচ্ছেদ্য নাম। যতদিন পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ থাকবে, যতদিন বাঙালির ইতিহাস থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু থাকবেন অমর অবিনশ্বর। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, ভাষা, সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতার মধ্যে একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালিরূপে বঙ্গবন্ধু থাকবেন চিরজাগ্রত। রাজনৈতিক গবেষণা সংস্থা ইউএসবি’র (টঝই) ভাষায় বঙ্গবন্ধু ‘ডড়ৎষফ চড়ষরঃরপধষ চড়বঃ’। সভ্যতার শুরু থেকেই বারবার মানবতা হয়েছে ভূ-লুণ্ঠিত। শোষক ও শোষিতের ব্যবধান বেড়েছে। উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে শোষণের মাত্রা। হোক তা প্রাচ্য কি তার বিপরীত গোলার্ধ। তাই কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের উপর অমানুষিক নির্যাতন বন্ধে, মানুষ হিসেবে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়োজন পড়েছিল একজন মার্টিন লুথার কিং বা ম্যালকম ম্যাক্সের। ঠিক তেমনি বাঙালিদের অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি সীমাহীন বৈষম্য রোধ করতে দরকার হয়েছিল একজন শেখ মুজিবুর রহমানের মতো মহানায়কের। পাকিস্তান কেবল অর্থনৈতিকভাবে আমাদের শোষণ করতে চায়নি, বরং তাদের আগ্রামী হাত দিয়েছিল আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি, সম্প্রীতিপূর্ণ পরিবেশ, শিক্ষা ইত্যাদির উপর। সামরিক স্বৈরশাসনের শাসনের মাধ্যমে প্রচণ্ড চাপ, অনিশ্চয়তা ও ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে যখন বাঙালিদের এরা হাতে ধরা সুতোয় পুতুলের মতো নাচাতে চেয়েছিল, ঠিক তখনই স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিলেন নিষ্ঠা, ভালোবাসা, আন্তরিকতা, একাগ্রতা, সাহসিকতায় এবং সর্বোপরি দৃঢ়তায় এই বজ্রকণ্ঠস্বরধারী মানুষটি। বাঙালির স্বাধীনতার মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন সেই ঐকান্তিক প্রয়োজনের সময়। বঙ্গবন্ধু বরাবরই অটল থেকেছেন তাঁর নীতিতে। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেছেন অহিংস পন্থায় বাঙালির অধিকার অর্জনের এ আন্দোলনে সফল হতে। তাই দেখা যায়, ১৯৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর ক্ষমতা তাদের না দেওয়ার পরও তিনি সহিংসতায় না গিয়ে তিনি ভুট্টোর ক্ষমতাভাগের দাবির তীব্র সমালোচনা করেন। যুক্তিসঙ্গত দাবি না মানার পর পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়াতেই ৭ মার্চ তাঁকে রচনা করতে হয় বাঙালির জীবনের এক অনন্য সাধারণ মানব মুক্তির কবিতা। ১৯৬৩ এর ২৮ আগস্ট বর্ণবাদী আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং এর সেই ‘আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম’ মহাকাব্যের পর আরো একটি মহাকাব্য রচিত হয় ১৯৭১ এর ৭ মার্চ রেসকোর্সের ময়দানে। সাড়ে ৭ কোটি মানুষের জন্য তাঁর ভাষণ সর্বশ্রেষ্ঠ মহাকাব্য রচনার মাহেন্দ্রক্ষণ যা দিয়েছে আমাদের লাল সবুজের পতাকার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবনব্যাপী একটিই সাধনা করে গেছেন, তা হলো বাংলা ও বাঙালির মুক্তির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করা। তাঁর এই সাধনার শুরু ১৯৪৮ থেকে। তাই ১৯৪৮-এর জানুয়ারির ৪ তারিখে গঠন করেছিলেন ছাত্রলীগ এবং ১৯৪৯-এর জুনের ২৩ তারিখে আওয়ামী লীগ। সেই থেকে বাঙালির জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের প্রতিটি আন্দোলনকে সুপরিকল্পিতভাবে নেতৃত্ব প্রদান করে ধাপে ধাপে এগিয়ৈ নিয়ে গেছেন। ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিরেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান্ বাল্যকাল ও কৈশোর থেকেই যে সংগ্রামের শুরু, তা থেমে থাকেনি। বরং কালক্রমে তা বিস্তৃত ও প্রসারিত হয়ে সমগ্র বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের এক মহৎ প্রচ্ছদপট এঁকে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রূপকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হয়ে ওঠেন ইতিহাসের মহামানব। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর জীবনের প্রতিটি ধাপেই বাঙালির সার্বিক মুক্তির জয়গান গেয়েছেন। তিনি তো সবসময় বলতেন, এমনকি দু-দুবার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি বলেছেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলল, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।’ যে বাংলার স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, যে বাংলার জন্য তিনি যৌবনের অধিকাংশ সময় কারাগারে কাটিয়েছেন, ফাঁসির মঞ্চে গেয়েছেন বাঙালির জয়গান, সেই বাংলা ও বাঙালির জন্য তাঁর ভালোবাসা ছিল অপরিসীম। বিশাল হৃদয়ের মহৎ মনের মানুষ ছিলেন তিনি। নিজের সবকিছুই জনগণের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। সরল সাদামাটা জীবন ছিল তাঁর। রাষ্ট্র ক্ষমতার আসীন হয়েও ছিমছাম আর আটপৌরে ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটিতেই আমৃত্যু থেকেছেন। একবার এক জনসভায় তিনি বলেছিলেন, ‘একজন মানুষ আর কী চাইতে পারে, আমি যখন ভাবি দূরে এক জনশূন্য পথের ধারে আধো আলো-ছায়ায় এক লোক লণ্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে আছে শুধু আমাকে এক নজর দেখবে বলে, তখন মনে হয়, একজন মানুষের পক্ষে আর কী চাওয়া-পাওয়ার থাকতে পারে। নিরন্ন, হতদরিদ্র, মেহনতী মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ছিল প্রগাঢ় ভালোবাসা। তা প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর প্রতিটি কর্মে ও চিন্তায়। ১৯৭৩-এর ৯ সেপ্টেম্বর, আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘বিশ্ব আজ দুই ভাগে বিভক্ত, শোষক ও শোষিত। আমি শোষিত।’ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূল সারাংশ ছিল শোষণ-নিপীড়ন থেকে মানুষের মুক্তি অর্থাৎ শোষণমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। সেই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ১৯ মিনিটের ভাষণে বঙ্গবন্ধু সেই স্বপ্নই দেখিয়েছিরেন ৭ কোটি বাঙালিকে। তিনি দেখিয়েছিলেন এদেশের নিপীড়িত শোষিত মানুষের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নেই বাঙালির মনে জাগ্রত করেছিল অদম্য স্পৃহা। আর সেই ভিত্তিতেই দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধে ৩০ লাখ বাঙালির রক্ত আর অগণিত মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত হয় সেই কাক্সিক্ষত মুক্তি মহান স্বাধীনতা। শুরু হয় বাংলাদেশ নামের দেশের নতুন যাত্রা। বাংলাদেশের মহান রাষ্ট্রপতিরূপে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যাত্রা। সোনার বাংলার সোনার মানুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের রাষ্ট্রপতি। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি সমগ্র বাংলাদেশে কাজ করে চলেছিলেন। বেকার যুবকদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, শ্রমিকের হাতকে শক্তিশালী করে ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য এগিয়ে চলছিলেন। তখনই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বিপথগামী ঘাতক সেনাসদস্যদের গুলিতে বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির এগিয়ে চলাকে যবনিকা ঘটার চেষ্টা চালায়। কিন্তু না, যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে দেখিয়েছিলেন সেই স্বপ্ন কি স্বপ্নই থেকে যাবে? না, বাঙালি জাতি আবারও এগিয়ে চলল। জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিরূপে দেশে প্রত্যাবর্তন করে জনগণের হাতকে শক্তিশালীরূপে ভোটযুদ্ধে অংশ নিয়ে নেত্রীকে বিজয়ের মালা পরিয়ে বাংলার প্রধানমন্ত্রী করেছেন জনগণ। সে শেখ হাসিনা আজ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য জীবন-মরণ বাজি রেখে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। শতবাধা ডিঙিয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাকে আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপে প্রতিষ্ঠা করে বর্তমানে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতিকে সম্মান ও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর স্বপ্ন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়া। এই যাত্রা শুভ ও সফল হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*