চোখে দেখা ভয়াল ২৯ এপ্রিল

বজলুল হক :: চট্টগ্রাম শহরের অতি সন্নিকটে বঙ্গোপসাগরের কূল ঘেষে আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের গহিরা গ্রামেই আমার জন্ম । কি সুন্দর গ্রাম! মাছে ভাতে বাঙ্গালী এই কথা উক্ত গ্রামেই ফুটে উঠত । পুকুর ভরা মাছ, গোলা ভরা ধান ,গোয়াল ভরা গরু সবই ছিল। শিক্ষাদীক্ষায় অনুন্নত থাকলেও সবার বসবাস ছিল ভ্রাতৃত্বসুলভ। আর এই সুন্দর গ্রামকেই লণ্ডভণ্ড করে দিল ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল ভয়াল ঘূর্ণিঝড়। আজ থেকে প্রায় ২৪ বছর আগের কথা। তখন আমি ৫ম শ্রেণীর ছাত্র। অন্য দিনের মত সকালে উঠে নাস্তা খেয়ে মক্তবে পড়তে গেলাম । অন্যান্য গ্রামের মত আনোয়ারা উপজেলার গহিরা গ্রামে সাধারণত ফজরের নামাজের পর পরই মক্তবে কোরআন পড়া শুরু হয়। সকালে আবহাওয়াটা খুব ভাল ছিল । রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে আরবী পড়া শেষ করেই প্রস্তুতি নিতে লাগলাম স্কুলে যাওয়ার জন্য তখন সকাল ৯টা। রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশ হঠাৎ মেঘাচ্ছন্ন, মনে হয় এক্ষুণি বৃষ্টি আসবে কিন্তু না বৃষ্টি হয়নি তাই চলে গেলাম স্কুলে। স্কুলে গিয়ে দেখি আবহাওয়া আরো খারাপের দিকে। এই গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি এই রোদ। স্কুলে সবাই বলাবলি করছে বঙ্গোপসাগরে নাকি ঘূর্ণিঝড় হয়েছে। তুফান হবে জলোচ্ছ্বাস হবে। আমি তো ছোট মানুষ এইগুলোর মধ্যে মাথাব্যাথা নাই। ১টায় স্কুল ছুটি, গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মধ্যে মাথার উপর বইয়ের ব্যাগ নিয়ে দৌঁড়ে দৌঁড়ে বাড়ী ফিরলাম। আম্মাকে ঘূর্ণিঝড়ের কথা বললাম। আম্মা বলল আল্লাকে বল কিছু হবে না। আমিও স্বাভাবিকভাবে অন্যদিনের মত খেলাধুলার মধ্যে মগ্ন ছিলাম । এভাবে সন্ধ্যা হল দেখি বাতাস ও বৃষ্টির মাত্রা সামান্য বেড়েছে সেই সাথে চতুর্দিকে গুমোট অন্ধকার। যে যার মত করে ঘরে ফিরছে। আম্মা আর আব্বা প্রতিবেশীদের সাথে যোগাযোগ করছে কি হচ্ছে কি হবে এই বিষয় নিয়ে। বলতে বলতে বাতাসের গতিবেগ ক্রমেই বাড়ছে আর বাড়ছে। বাতাসের প্রচন্ড গতিবেগের মধ্যেও আম্মা সবাইকে রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ করালেন। আব্বা গোয়াল ঘরে ঢুকে গরুর রশি খুলে দিলেন । প্রচন্ড বাতাসে আতঙ্কিত হয়ে পাড়া-প্রতিবেশী একে অপরকে ডাকাডাকি করতে লাগলেন। চতুরদিকে চিৎকার-চেচামেচি । কিন্তু বুঝে উঠার আগেই আমাদের উঠােনে পানি। এবার কি করা আমরা ঘর থেকে বের হয়ে পড়লাম । আমরা ৫ ভাই ২ বোনের মধ্যে বড় ভাই লেখাপড়ার কারণে চট্টগ্রাম শহরে এবং বড় বোন শ্বশুর বাড়ীতে, বাকীরা সকলেই ঘরে। দেখতে দেখতে পানির গ্রোতে আমাদের রান্না ঘর ভেঙে গেল। আমি আর আব্বা ছাড়া বাকীরা সবাই রান্না ঘরের চালে উঠে পড়ল। পানির স্রোত আমার আম্মা, ভাই-বোন সবাইকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল আর দেখলাম না। আমি আব্বার সাথে থাকায় উনি আমাকে নিয়ে আমাদের একটি বড় ফুল গাছ ছিল, সে গাছে উঠে পড়লেন। খোলা আকাশে সারারাত আব্বা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে নিজে প্রচন্ড কষ্ট সহ্য করলেন। কি কষ্ট যে পেলাম তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। যা হোক সকাল হলো। সকালে দেখি সব ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে। কাচা-আধা পাকা সব ঘর মাটির সাথে মিশে গেল। গাছপালা উপড়ে গেল, আগের দিনের যে চিত্র তা উল্টো হয়ে গেল। নেই কোন মানুষজন, গবাদী পশু। পুরো এলাকায় যেন পানি আর পানি। আমাদের যে বেড়ীবাঁধ ছিল তা মাটির সাথে সমান হয়ে গেল। ভাবলাম এই বুঝি কেয়ামত। আব্বা আর আমি ছাড়া আর কেউ নাই। এখন খুজতে লাগলাম আম্মা কোথায়, আমার অন্য ভাই বোন এরা কোথায়, কারো কোন দেখা নাই। আম্মা অসুস্থ থাকায় বেশী চিন্তায় ছিলাম বুঝি আম্মা আর বেচে নাই। রাখে আল্লাহ মারে কে-আম্মা ছিল আমার সেজ ভাইয়ের সাথে, ছোট বোন ছিল মেজ ভাই এর সাথে। আরেক ছোট ভাই হয়ে গেল একা। নিজের জীবন বাজি রেখে সেজ ভাই আম্মাকে ধরে রাখলেন। আর মেঝ ভাই ধরে রাখলেন ছোট বোনকে। আশ্চর্য্যজনক হলেও সত্যি যে সকালে সবার আগে আমি দেখেছি আম্মাকে সুস্থ অবস্থায় সেঝ ভাই নিয়ে এসেছে। আম্মাকে পেয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম। সন্ধ্যার দিকে ছোট বোনকে নিয়ে মেঝ ভাই এসেছে। শুনেছি মেঝ ভাই ছোট বোনসহ সাঙ্গু নদী পাড়ি দিয়ে জুঁই দন্ডী ইউনিয়নে চলে গিয়েছিল। যা হোক বাঁচানোর মালিক আল্লাহ। ঘরের সবাই আসলেও আসছে না ছোট ভাই জালাল সে বর্তমানে সেনা বাহিনীতে কর্মরত আছে । এবার ভাবলাম সে বেঁচে নাই। এরই মধ্যে আশে পাশের অনেক প্রতিবেশীর মৃত্যুর খবর পেলাম। হতবাক হলাম কি হল গতকাল। যে লোককে গতকাল আমাদের মাঝে দেখেছি তিনি এখন আর নেই। অনেকেই নাই “ অল্প শোকে কাতর অধিক শোকে পাথর” এই প্রবাদই বাস্তব হল । সবার মৃত্যু দেখে কান্না যেন আর আসে না। পরের দিন দেখলাম মরা মানুষের সাথে গবাদী পশু, মানুষ খুজছে তার প্রিয় আপনজনকে যে যার মত করে। কেউ খুজে পাচ্ছে কেউ পাচ্ছে না। এমনও দেখেছি মরা মানুষকে কুকুর খাচ্ছে। আমার যেই বয়স সেই বয়সে এমন দৃশ্য কি কল্পনা করা যায় ? অবশ্য ২/১ দিন পর নৌবাহিনী /সেনাবাহিনী এবং অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এগিয়ে এসেছে বেওয়ারিশ লাশ দাফনের জন্য। ছোট ভাইয়ের কথাতো বলা হয়নি সে ৩দিন পর ফেরত এসেছে বাঁশখালী থেকে। ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাসে বাঁশখালীতে ভেসে গিয়েছিল। এই ঘূর্ণিঝড়ে আপনজনের এক হ্নদয় বিদারক বর্ণনা না দিয়ে পারছি না। তিনি হলেন আমার আপন বড় বোন। উনার ২ ছেলে ৩ মেয়ে নিয়ে গোছানো সুন্দর সংসার। এই ঘূর্ণিঝড়ে তার স্বামীসহ ২ ছেলে ৩ মেয়ে হারিয়ে প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। এমন হতভাগ্য অবস্থা কি মেনে নেওয়া যায় তবুও মেনে নিতে হবে আল্লার ইচ্ছা । অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী হারিয়ে পুরো এলাকা জুড়ে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল যা বলার মত নয়। ২৪ বছর আগে ঘটে যাওয়া এই ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ের কথা মনে পড়লে আজও যেন শরীর শিহরিয়ে উঠে। পরিশেষে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি আল্লাহ যেন এমন বিপদের মুখোমুখি আমাদের আর না করে এবং ঘটে যাওয়া বিপদ যেন মন থেকে ভুলে গিয়ে আমরা সাহসিকতার সহিত সামনে এগিয়ে যেতে পারি। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন । এই ঘূর্ণিঝড়ে যারা ইন্তেকাল করেছেন আল্লাহ তাঁদের বেহেস্ত নসিব করুন।
বিপদে মোদের রক্ষা করো এই নহে মোর প্রার্থনা
বিপদকে যেন করিতে পারি জয়।
লেখক বর্তমানে দৈনিক আমাদের চট্টগ্রামের সিনিয়র ফটো সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*