ই’তিকাফ আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি ও পুরস্কার হাসিলের উদ্দেশ্যে লাইলাতুল কদর তালাশের মোক্ষম সময়

রমজান মাস হচ্ছে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। মহানবি হযরত (স.) বরকত ও মহত্বের বিবরণ দিতে গিয়ে বলেছেন, তিনি এরশাদ করেন, “রমজান মাস বরকত ও মহত্বের মাস, এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ মাস আর কোনটি নেই।” তিনি আরো বলেছেন, “যারা রমজান মাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রেখেছে তারা ঐ দিনের মত নিষ্পাপ হয়ে যায় যে দিন তাদের জননী তাদেরকে নিষ্পাপ প্রসব করেছিল।” রাসুল করিম (স.) এর বাণীতে রমজানুল মুবারকের বরকত, মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে যা মুমিনগণকে ইবাদতে মশগুল হওয়ার প্রতি আকৃষ্ট করে তুলবে। তিনি আরো এরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াবের আশায় রোজা রাখবে ও রাতে কিয়াম করবে আল্লাহ তায়ালা তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাপ করে দিবেন।” এ হাদিসের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় রমজান মাস হচ্ছে ইবাদতের মাস।
এ মাসের রোজা, তারাবীর সালাত যেমন ইবাদত, তেমনিভাবে ই’তিকাফ রমজান মাসের একটি বিশেষ ইবাদত। যার মাধ্যমে লাইলাতুল কদর লাভের সৌভাগ্য অর্জন করা সহজ হয়। রমজানের রোজা ব্রত পালনের চরম ও শেষ পর্যায় শেষের দশ দিন। এই সময়টির প্রতি মুহূর্তই হচ্ছে অমূল্য সম্পদ ই’তিকাফের মাধ্যমে এর সদ্ব্যবহার সুনিশ্চিত করা সহজ হয়। তাই মহানবি (স.) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামগণ এমন কি উম্মুল মুমিনীনরাও (রা.) এর সুযোগ হাতছাড়া করেননি। হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, “যখন রমজানের শেষের দশদিন এসে যেত তখন রাসুল (স.) দৃঢ় সংকল্প হতেন ও ইবাদত বন্দেগিতে মগ্ন থেকে রাত কাটাতেন এবং পরিবারের লোকদেরকে জাগাতেন।” (সহীহ বুখারী, মুসলিম)। তিনি আরো বলেছেন, “নবি করিম (স.) রমজানের শেষের দশকে তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ই’তিকাফ করেছেন এরপর তার স্ত্রীগণও উক্ত সময়ে ই’তিকাফ করেছেন।” (সহীত বুখারী, মুসলিম)। রাসুল করিম (সা.) এরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি রমজানে দশদিন ই’তিকাফ করবেন সে যেন দুটি হজ্জ ও দুটি ওমরাহ করল।” অর্থাৎ দুটি হজ্জ ও দুটি ওমরার সওয়াব পাবে।
ই’তিকাফের বিশুদ্ধতা পবিত্র কুরআন, হাদিসে নববী ও ইজমা দ্বারা প্রমাণিত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন, “তোমরা যখন মসজিদে ই’তিকাফ অবস্থায় থাক তখন আপন স্ত্রীদের সাথে মিলিত হয়ো না।” (সুরা বাকারা, ১৮৭)। শুধু আমাদের নবীর সময়ে নয়, পূর্ববর্তী নবীদের উম্মতদের মধ্যেও ই’তিকাফ প্রচলিত ছিল। যেমন আল্লাহ পাক বলেন, “আমি ইব্রাহীম ও ইসমাইল (আ.)-কে আদেশ করেছিলাম যে তোমরা আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, ই’তিকাফকারী ও রুকু-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র কর।” (সুরা বাকারা, ১২৫)। রাসুল করিম (স.) এর সময় থেকে আজ পর্যন্ত কোন ফকীহ বা ওলামায়ে ইকরামগণের মধ্যে ই’তিকাফ যে একটি বিশেষ ইবাদত এর মধ্যে কোন দ্বিমত নেই। রাসূল করিম (স.) হতে বর্ণিত আছে তিনি এরশাদ করেন, “তোমরা রমজানের শেষ দশদিনের মধ্যে বিজোড় রাত্রীগুলোতে লাইলাতুল কদরের সন্ধান কর।” এ হাদিসের আলোকে আমরা এ কথার প্রমাণ পাই যে লাইলাতুল কদর পাওয়ার সুবিধার্থে রমজানের শেষ দশদিন ই’তিকাফ করা উত্তম।
ই’তিকাফের অনেক উপকারিতা রয়েছে। ই’তিকাফ মানুষকে দুনিয়ার ঝামেলা ত্যাগ করার অভ্যাস শিক্ষা দেয় এবং অল্পকালের জন্য হলেও আল্লাহর সাথে তার সম্পর্ক জুড়িয়ে দেয়। এতে মানুষের পক্ষে অন্তিমকালে দুনিয়া ত্যাগ করা সহজ হয় এবং দুনিয়ার মহব্বতের স্থলে আল্লাহর প্রতি মহব্বত বৃদ্ধি পায়। দশদিন মসজিদে থাকার কারণে প্রতি ওয়াক্ত নামাজ জামাতে পড়ার সুযোগ পাওয়া যায়। আজেবাজে কথা থেকে রেহাই পাওয়া যায়। ইবাদতে একাগ্রতা সৃষ্টি হয়। বেশি বেশি ইবাদত করার মানসিকতা সৃষ্টি হয়। এ ই’তিকাফে লাইলাতুল কদর পাওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া যায়।
ই’তিকাফকারীদের উদাহরণ দিতে গিয়ে বলা হয়েছে যে কোন হাজতি ব্যক্তি মহান ব্যক্তির দরবারে গিয়ে হাত পেতে থাকে এবং বলে যে, যতক্ষণ না আমার হাজত পূরণ করা হয় আমি এই দরবার ত্যাগ করব না।
রাসুলে পাক (স.) রমজানের শেষ দশদিন আসার পূর্বেই মসজিদের একটি স্থান নির্দিষ্ট করে সেখানে পর্দা ও চাঁটাই বিছিয়ে নিতেন। রমজানের বিশ তারিখের ফজরের নামাজ আদায় করে সে নির্দিষ্ট স্থানে চলে যেতেন এবং ঈদের চাঁদ দেখার পর সেখান থেকে বের হতেন। (বোখারী)।
আল্লাহর রাসুল (স.) ই’তিকাফকারী সম্পর্কে বলেছেন, “ই’তিকাফকারী একদিকে গুনাহ হতে বিরত থাকে, অপরদিকে ই’তিকাফের কারণে সে অন্যান্য যে সমস্ত নেক কাজ করতে পারেনি তার আমলনামায় কার্যত আদায়কারীর ন্যায় সমুদয় নেকী লেখা হয়।
ই’তিকাফ করতে হলে আমাদের প্রত্যেকের অবগত হওয়া জরুরী যে ই’তিকাফ কী, কেন করতে হবে, ই’তিকাফের অর্থ তাৎপর্য, রীতিনীতি, শর্ত, আদব এবং এর উপকারিতা সম্পর্কে।
ই’তিকাফ শব্দের আভিধানিক অর্থ অবস্থান করা, আবদ্ধ করে রাখা। শরীয়তের পরিভাষায় ইবাদতের নিয়তে মহান আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে এমন মসজিদে অবস্থান করা যে মসজিদে ইমাম মুয়াজ্জিন নিযুক্ত আছেন এবং জামাআত হয়। আর নারীদের জন্য এমন গৃহ যেখানে গৃহবাসীর যাতায়াত কম থাকে অথবা নামাজের নির্দিষ্ট স্থানে।
ই’তিকাফ তিন প্রকার। (১) ওয়াজিব, (২) সুন্নাহে মুয়াক্কাদা, (৩) নফল বা মুস্তাহাব।
(১) ওয়াজিব ই’তিকাফ: যদিকোন লোক মান্নত করে যে আমার অমুক কাজ হয়ে গেলে আমি ই’তিকাফ করব। উক্ত কাজ হয়েগেলে তাকে রোযা সহ মসজিদে ইবাদতের নিয়্যাতে ই’তিকাফ করতে হবে। মানত শর্ত বিশিষ্ট হউক বা শর্তহীন হউক তার উপর ই’তিকাফ করা ওয়াজিব। (গুলজারে শরিয়ত)
(২) সুন্নাতে মুয়াক্কাদা: প্রত্যেক রমজান মাসের শেষ দশদিন মহল্লাবাসী থেকে যে কোন একজন ইবাদতের নিয়্যাতে রোযাসহ মসজিদে অবস্থান করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা আলাল ফিকাইয়া। মহল্লা বা এলাকা থেকে যদি উক্ত ই’তিকাফ পালন না করে তবে সকলে গোণাহ গার হবে। যে কোন একজনে পালন করলে সকলে দায়মুক্ত হবে। (গুলজারে শরীয়ত)
(৩) মুস্তাহাব বা নফল ই’তিকাফ: ওয়াজিব ও সুন্নাতে মুয়াক্কাদা আলাল কেফয়া ব্যাতিত যে কোন ই’তিকাফ এবং অল্পক্ষণের জন্য ই’তিকাফের নিয়্যাতে মসজিদে অবস্থান করাকে মুস্তাহাব বা নফল ই’তিকাফ বলা হয়।
ই’তিকাফ শুদ্ধ হওয়ার শর্ত: ইতিকাফের ভেতরে অনেক শর্ত রয়েছে প্রথম শর্ত নিয়্যাত করা, নিয়্যাত ব্যতীত ই’তিকাফ করলে “এজমা” মতে জায়েজ হবে। দ্বিতীয় শর্ত মসজিদে জামাআত হওয়া অর্থাৎ যে মসজিদে আজান, ইকামত জামাআত হয় সে মসজিদে ই’তিকাফ জায়েয এটি বিশুদ্ধ মত (ফতোয়ায়ে আলমগীর)। এ মাসআলাটি খোলাছাহ কিতাব থেকে নেওয়া হয়েছে। অবশ্য মসজিদে হারামে ই’তিকাফ করা সর্বাধিক ইত্তম। মহিলাদের জন্য মসজিদে ই’তিকাফ করা জয়েজ আছে তবে মাকরুহ এ মাসআলাটি ফতোয়ায়ে আলমগীরের লেখক মুহীতে সুরুখসী কিতাব থেকে নিয়েছেন। তৃতীয় শর্ত ই’তিকাফকারী রোযাদার হওয়া চাই। রোযাদার ব্যতীত ই’তিকাফ হবে না। চতুর্থ শর্ত হচ্ছে ই’তিকাফকারীকে অবশ্যই মুসলমান হতে হবে। অমুসলিম ই’তিকাফ করতে পারবে না। পঞ্চম শর্ত জ্ঞানী হওয়া চাই। যেহেতু কাফির ব্যক্তি ইবাদতের যোগ্যতা রাখেনা এবং পাগল নিয়্যাত করার যোগ্যতা রাখেনা সুতরাং ই’তিকাফ করার জন্য জ্ঞানী হতে হবে (ফতোয়ায়ে আলমগীর)। ষষ্ঠ শর্ত মহিলাদের জন্য হায়েজ, নেফাস থেকে মুক্ত থাকা।
ই’তিকাফের রীতি-নীতি: ই’তিকাফের কতগুলো রাীতি-নীতি রয়েছে যেমন পূণ্যজনক কর্থা বার্তা ছাড়া কোনরূপ কথা, বার্তা না বলা। রমজানের শেষ দশদিন ই’তিকাফের জন্য অবশ্যক করে নেওয়া। ই’তিকাফের জন্য আফজল মসজিদ নির্ধারিত করা, ই’তিকাফের মধ্যে কর্তব্য হল কুরআন মজীদ তিলওয়াত করা, হাদীস শরীফ দ্বীনি জ্ঞান সম্পর্কিত আলাপ আলোচনা ও শিক্ষা আদান-প্রদান করা হুজুর পাক (স.) এবং অন্যান্য আম্বিয়া কেরামদের জীবনী আলোচনা করা, আউলিয়া কেরামদের দ্বীনি কার্যকলাপ এবং ওয়াজ নসীহত সম্পর্কিত আলাপালোচনা এবং দ্বীনি মসআলা মসায়েল সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন করা ইত্যাদি। মাসআলা ফতহুল কাদীর কিতাব থেকে নেওয়া হয়েছে। ই’তিকাফকারী আল্লাহর নৈকট্য লাভের, জন্য নিজে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ইবাদতে সুফর্দ করবেন এবং পার্থিব কাজ হতে নিজেকে দুরে রাখবে। ই’তিকাফকারী সম্পূর্ণ সময় নামাযের মধ্যে অতিবাহিত করে। ই’তিকাফকারীরা নিজেদের ঐ সকল লোকদের সদৃশ্য করে থাকে যাদের শানে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেছেন উনারা নাফরমানী করে না সে নিদর্শন সমূহের যা আল্লাহ হুকুম করেছেন এবং উহাই পালন করেন আল্লাহ আদেশ করেছেন এবং যারা দিনে রাত্রে আল্লাহর তাসবীহ পাঠে রত থাকেন।
ই’তিকাফে কতগুলো বর্জনীয় কাজও রয়েছে যেমন ইতিকাফ অবস্থায় একেবারে চুপ থাকা এবং চুপ থাকাকে ইবাদত মনে করা। মুখের গুণাহ হতে বিরত থাকা। গালি গালাজ, ঝগড়া বিবাদ ইত্যাদি বর্জন করে চলা, সকল প্রকার গর্হিত কাজ থেকে বিরত থাকা। ই’তিকাফের সময় কারো গীবত করা বা সমালোচনা করা হারাম।
ই’তিকাফ ভঙ্গ হওয়ার কারণ:
(১) বিনা কারণে অর্থাৎ প্রস্রাব পায়খানা ছাড়া অন্য কারণে মসজিদ হতে বের হয়ে গেলে।
(২) নিজ গৃহে পায়খানা প্রস্রাব করতে গিয়ে দেরি করলে।
(৩) মসজিদের ভিতরে গোসলের ব্যবস্থা থাকা সত্তেও বাইরে গিয়ে গোসল করলে।
(৪) কোন রোগীকে দেখতে গেলে বা জানাযায় শরীক হলে।
(৫) ডুবন্ত বা অগ্নিদগ্ধ ব্যক্তি উদ্দার করার জন্য বাহির হলে।
(৬) জিহাদের জন্য বা স্বাক্ষী দেওয়ার জন্য বাহির হলে।
(৭) সহবাসের আনুসাঙ্গিক বিষয়াদি (আলিঙ্গন, চুম্বন, স্পর্শ) ঘটলে।
উপযুক্ত কারণ গুলো ঘটে গেলে অবশ্যই ইতিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে।
সুতরাং আল্লাহ পাক আমাদের সঠিক ই’তিকাফ পালন করার তৌফিক দান করুন আমীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*