পাহাড়ের মৎস্য সম্পদ থেকে রাজস্ব আয় রেকর্ড ছাড়িয়েছে

আলমগীর মানিক,রাঙামাটি::
প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরও কাপ্তাই হ্রদে মাছের উৎপাদান অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কাপ্তাই হ্রদ থেকে ১০ হাজার ১৪১ মেট্রিক টন মাছ আহরণ করা হয়েছে। সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে ১৩ কোটি ২৩ লক্ষ ৯৭ হাজার টাকা। যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ লাখ টাকা বেশি। বিগত পাঁচ বছরের ইতিহাসে কাপ্তাই হ্রদে মাছ উৎপাদনের ক্ষেত্রে এই রেকর্ড দ্বিগুণেরও বেশি। এছাড়াও মাছের উৎপাদনের পাশাপাশি পুরাতন বরফ কল মেরামতের মাধ্যমে বরফ উৎপাদনেও অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙ্গে নতুন লক্ষ্যমাত্রায় উপার্জন করেছে কর্তৃপক্ষ।
বিএফডিসি’র বিগত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায় কাপ্তাই হ্রদে ২০১৩–১৪ অর্থ বছরে ৭ হাজার ৭২৬ মেট্টিক টন মাছ উৎপাদন হয়েছে। সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে ৬ কোটি ৬৮ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। ২০১৪–১৫ অর্থ বছরে ৮ হাজার ৬৪৫ মেট্টিক টন মাছ উৎপাদন হয়েছে। সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে ৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। ২০১৫–১৬ অর্থ বছরে মাছ উৎপাদন হয়েছে ৯ হাজার ৫৯০ মেট্রিক টন। এতে রাজস্ব আয় হয়েছে ১০ কোটি ৬০ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। ২০১৬–১৭ অর্থ বছরে মাছ উৎপাদন হয়েছে ৯ হাজার ৯০৫ মেট্টিক টন। রাজস্ব আয় হয়েছে ১২ কোটি ৭৫ লাখ ১৭ হাজার টাকা। বর্তমানে ২০১৭–১৮ অর্থ বছরে এ পর্যন্ত কাপ্তাই লেকে মাছ উৎপাদন হয়েছে ১০ হাজার ১৪১ মেট্টিক টন এবং রাজস্ব আয় হয়েছে ১৩ কোটি ২৩ লাখ ৯৭ হাজার টাকা।সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায়, গত বছর ২০১৭ সালের ১৩ জুন রাঙ্গামাটির বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ পাহাড় ধসের ফলে কাপ্তাই হ্রদের মারাত্মক ক্ষতি হয়। রাঙ্গামাটির পুরো জেলার বৃষ্টির পানি কাপ্তাই হ্রদে পড়ে এবং পানি ঘোলা হয়ে যাওয়ার ফলে হ্রদের কয়েক প্রজাতির মাছ মরে যায়। তার পরও সীমিত জনবল নিয়ে বিশাল কাপ্তাই হ্রদের বিশাল মৎস্য ভাণ্ডারের মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে এবং বিএফডিসির কর্মকর্তাদের আন্তরিকতায় উৎপাদন যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ ব্যাপারে রাঙ্গামাটি বিএফডিসি’র ব্যবস্থাপক কমান্ডার মো. আসাদুজ্জামান জানান, কাপ্তাই হ্রদ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সর্ববৃহৎ কৃত্রিম হ্রদ। বিগত বছর ১৩ জুনের ভয়াবহ পাহাড় ধস এবং পরবর্তী সময়ে অক্টোবর পর্যন্ত বৃষ্টি ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে কাপ্তাই হ্রদের প্রাকৃতিক পরিবেশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যা হ্রদের মৎস্য উৎপাদনের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। পাহাড় ধসের কারণে হ্রদের পানি ঘোলাটে হয়ে যায়, ফলে পানিতে মাছের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের পরিমাণ হ্রাস পায়। এতে ছোট জাতের কাচকি ও চাপিলা মাছ মরে যায়। কাপ্তাই হ্রদে এই দুই প্রজাতির মাছ রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস। পানির উচ্চতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘ সময় ধরে হ্রদের পানি অপসারণের জন্য কাপ্তাই জলবিদ্যুত কেন্দ্রের স্পিলওয়ে খুলে রাখা হলে হ্রদের স্বাভাবিক মৎস্য উৎপাদন ব্যাহত হয়।
এ পরিস্থিতির কারণে মৎস্য উৎপাদন বিগত বছরের তুলনায় কম হওয়ার আশংকায় এ বছর ব্যবসায়ীরা মৎস্য আহরণের সময় বাড়ানোর জন্য অনুরোধ করেন। সার্বিকভাবে ২০১৭–২০১৮ অর্থ বছরে মৎস্য উৎপাদন ২০১৬–২০১৭ বছর হতে কম হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছিল। তবে আশার কথা হলো এতো সকল প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যও বর্তমান অর্থ বছরে কাপ্তাই হ্রদ হতে রেকর্ড সংখ্যক ১০ হাজার ১৪১ মেট্টিক টন মাছ আহরণ এবং ১৩ কোটি ২৩ লাখ ৯৭ হাজার টাকা সরকারি রাজস্ব আয় করে রাঙ্গামাটিস্থ বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। শুধু মৎস্য উৎপাদন নয় বরফ উৎপাদনেও অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙ্গে নতুন লক্ষ্যমাত্রায় উপার্জন করেছে বিএফডিসি। অথচ বিএফডিসি’র বরফ কলটির যন্ত্রাংশ সবই পুরাতন এবং কাযক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিএফডিসি রাঙ্গামাটি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে জনবলও পূর্বের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে। এতে হ্রদের মৎস্য সম্পদের ব্যবস্থাপনায় বিএফডিসি কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতা ও দক্ষতার পরিচয় মেলে। দক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে অতিতের সকল রেকর্ড ভেঙ্গে সর্বোচ্চ পরিমাণ মৎস্য আহরণ ও রাজস্ব আয় করা সম্ভব হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
গত বছর কাপ্তাই হ্রদ থেকে মৎস্য আহরণের বিষয়ে জানতে চাইলে কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি থেকে জানানো হয়, গতবছর হ্রদ হতে মৎস্য আহরণ মৌসুমের শুরুর দিকে পাহাড় ধসের কারণে হ্রদের পানি ঘোলা হয়ে যায়, ফলে হ্রদের কাচকি ও চাপিলা মাছ সহ অন্যান্য ছোট প্রজাতির মাছ মারা যায়। ঐ সময়ে পানির উচ্চতা অত্যন্ত বেশি ও হ্রদে ব্যাপক থাকায় জেলেরা ঠিক মতো হ্রদে জাল ফেলতে পারেনি। ফলে শুরুর দিকে কাঙ্খিত মৎস্য আহরণ করা সম্ভব হয়নি। এতে ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তা সত্বেও মৎস্য ব্যবসায়ী ও জেলেদের আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং বিএফডিসি’র সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার কারণে আমরা রেকর্ড পরিমাণ মৎস্য আহরণ ও রাজস্ব আদায়ে সমর্থ হয়েছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*