আনোয়ারায় বেসরকারি চিকিৎসায় চরম নৈরাজ্য

এস,এম,সালাহ্ উদ্দীন::  আনোয়ারায় বেসরকারি চিকিৎসা সেবা খাতে নৈরাজ্য থামছে না। ভুল ও অপচিকিৎসার পাশাপাশি রোগীদের কাছ থেকে গলাকাটা অর্থ আদায় চলছে। এতে করে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে অনেকে পথে বসছেন। আর বিত্তশালীরা ছুটছেন বিদেশে। হত-দরিদ্রদের কাছে চিকিৎসা সেবা এখন দুষ্প্রাপ্য হতে চলেছে। দেশের সব বেসরকারি ক্লিনিক, ল্যাবরেটরি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসা সংক্রান্ত সব পরীক্ষা ও সেবার মূল্য তালিকা প্রদর্শনে উচ্চ আদালতের নির্দেশও কেউ মানছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, । এখানে অপ্রতুল সরকারি চিকিৎসা সেবার কারণে বেসরকারি চিকিৎসা সেবা খাতে এই নৈরাজ্য চলছে। চিকিৎসা ব্যয় দরিদ্র্যতার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো নিয়ম-নীতি ছাড়াই আনোয়ারায় বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠছে একের পর এক বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার। নামে-বেনামে করা এই সকল প্রতিষ্ঠানের স্থায়ীভাবে কোনো নিয়োগ নেই, নেই কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, কনসালটেন্ট অথবা নার্স। ফলে অদক্ষ চিকিৎসক দিয়ে চলছে চিকিৎসা সেবা। এতে প্রায়ই অবহেলায় রোগীর ভূূল চিকিৎসার অভিযোগ উঠছে। ডায়াগনস্টিক সেন্টার গুলোতে দেয়া হচ্ছে ভুল রিপোর্ট। একেক সেন্টারে একেক রকম আদায় হচ্ছে ফি। বিশিষ্ট জনদের অভিযোগ, চিকিৎসা সেবার আড়ালে ডায়াগনষ্টিক সেন্টার গুলো গ্রাম-গঞ্জের সাধারণ রোগীদের একগাঁদা টেষ্ট হাতে ধরিয়ে দিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। ডায়াগনষ্টিক সেন্টার গুলোর সামনে এবং দেওয়ালে টাঙানো হয়েছে দেশী-বিদেশী ডিগ্রীধারী ডাক্তারদের নামের তালিকা। তালিকায় যে সব ডাক্তারের নাম রয়েছে এদের অনেককে পাওয়া যায় না। গ্রামে-গঞ্জের বিভিন্ন গ্রাম্য ডাক্তারও কমিশনের ভিত্তিতে বিভিন্ন ডায়াগনষ্টিক সেন্টার গুলোর সাথে চুক্তি ভিত্তিক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে করে স্বাস্থ্য সেবাকে বাণিজ্যিক করণের ফলেই এমন অব্যবস্থাপনা ক্রমেই বাড়ছে। তথ্যমতে, আনোয়ারায় বেসরকারি ডায়ানস্টিক সেন্টার সংখ্যা প্রায় ১৫টি। কিন্তু এর বাইরেও চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে অনেক প্রতিষ্ঠান। এসব ডায়াগনষ্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের বেশিরভাগেরই কোন অনুমোদন নেই। যেসব ভবনে ডায়াগনষ্টিক সেন্টার গড়ে তোলা হয়েছে সেসব ভবনেরও অনুমোদন নেই। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-সিডিএ’র অনুমোদন ছাড়াই গড়ে উঠছে ভবনগুলো। ডায়াগনষ্টিক সেন্টার-ক্লিনিকের উপর প্রসাশনিক কোন নিয়ন্ত্রণও নেই। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে সেই দলের অনুসারিদের পরিচালক বানিয়ে নেতাদের সামনে রেখেই চলে চিকিৎসা সেবার নামে এই বাণিজ্য। আনোয়ারায় ১১ ইউনিয়নের মানুষের জন্য সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা শুধুমাত্র একটি। এখানের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল আনোয়ারা স্বাস্থ্য-কমপ্লেক্স। হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ৫০টি। তবে এর কয়েকগুণ বেশি রোগী সেখানে ভর্তি হচ্ছে। বিভিন্ন ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থাকলেও সেখানে চিকিৎসা সেবা বিশেষত উন্নত চিকিৎসার সুযোগ কম। তাই আনোয়ারা হাসপাতালেই রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এই হাসাপাতালেও নানা সঙ্কট আর সীমাবদ্ধতার কারণে রোগীরা বেসরকারি ডায়াগনষ্টিক সেন্টার উপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হচ্ছে। এই সুযোগে গত কয়েক বছরে আনোয়ারায় অসংখ্য বেসরকারি ডায়াগনষ্টিক সেন্টার-ক্লিনিক গড়ে উঠেছে। যাদের অনেকেরই নেই প্রয়োজনীয় অনুমোদন। অদক্ষ ও অনভিজ্ঞ চিকিৎসকদের দিয়ে চলছে এ হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা। স্থায়ীভাবে নেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং নার্স। জরুরি প্রয়োজনে চিকিৎসক আনার ব্যবস্থা থাকলেও তা অনেকটা মর্জি মাফিক। এতে সময় মত চিকিৎসা পান না রোগীরা, ফলে অবহেলায় কষ্ট পাচ্ছে রোগীরা। দেশের বিভিন্ন নাম করা ডায়গনষ্টিক সেন্টারে র‌্যাবের অভিযানে বেরিয়ে আসে অপারেশন থিয়েটারে অনুমোদনহীন ওষুধ ও মেয়াদোত্তীর্ণ অপারেশন সামগ্রী জব্দ করা হয়। এবং ল্যাবে কোন প্রকার পরিক্ষা ছাড়াই প্যাথলজি রিপোর্ট দেওয়ার প্রমাণ পায় র‌্যাবের ভ্রাম্যমান আদালত। এত অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনার পরও আনোয়ারা ডায়াগনষ্টিক সেন্টার গুলোর বিরুদ্ধে এখনও প্রসাশনের কোন ব্যবস্থা নেয়নি। সেবার মনোবৃত্তির চেয়ে বাণিজ্যকেই প্রাধান্য দেয়া এসব প্রতিষ্ঠানের লাগাম টেনে ধরার যেন কেউই নেই। এতে করে চিকিৎসার নামে এই বাণিজ্যের পণ্য হয়ে যাচ্ছেন রোগীরা। চিকিৎসায় ভুলের শিকার হলেও প্রতিকার পান না ভুক্তভোগীরা। জবাবদিহিতা নেই চিকিৎসকদের। রোগীর প্রতি নানা অবহেলাসহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। যে কারণে ডায়াগনষ্টিক সেন্টার-ক্লিনিক গুলোতে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও রোগীর প্রতি অবহেলা বেড়েই চলেছে। অভিযোগ রয়েছে, এতে ক্ষতিগ্রস্থরা সুবিচার থেকে বঞ্চিত হয়। রোগীদের জিম্মি করার ঘটনাও ঘটছে। আনোয়ারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান ডা. রাখাল চন্দ্র বড়ুয়া বলেন, বেসরকারি ডায়াগনষ্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকে চিকিৎসা সেবার মান নিশ্চিতে স্বাস্থ্য বিভাগ কাজ করছে। কোথাও কোন অপচিকিৎসা বা ভুল চিকিৎসার প্রমাণ পেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এবং সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশ মতো চিকিৎসা সংক্রান্ত সব পরীক্ষা ও সেবার মূল্য তালিকা প্রদর্শনে উচ্চ আদালতের নির্দেশ মেনে না চললে তাদের বিরুদ্ধে প্রসাশনের সহযোগীতা নিয়ে শ্রীঘই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*