নদীর তীরে উচ্ছেদ অভিযানে বিপাকে বৈধ স্থাপনার মালিকরা , বিএস খতিয়ানকে বিবেচনার দাবী


বিশেষ সংবাদদাতা ::
সম্প্রতি “দেশ বাচাঁও-নদী বাঁচাও”- কর্মসূচীর অধীনে শুরু হয়েছে উচ্ছেদ অভিযান। সরকার কর্তৃক প্রণীত এই অভিযান সকল মহলে সমাদৃত হয়েছে এবং সময় উপযোগী এই উদ্যোগকে সকলেই অভিনন্দন জানিয়েছে। তবে নদীর তীরে গড়ে উঠা শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং নানা ধরণের ওয়ার হাউজ এবং শিল্প সংশ্লিষ্ট স্থাপনা সমূহ উচ্ছেদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মহলকে আরও অধিক সচেতন এবং দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন বলে সকলেই মনে করে।
নদীর তীরে অবৈধ স্থাপনা যেমন রয়েছে তেমনিভাবে বৈধ স্থাপনাও গড়ে উঠেছে। অবৈধ স্থাপনা অপসারণের নামে কোনভাবেই বৈধ স্থাপনাকে উচ্ছেদের আওতায় আনা গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা। একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, নদীর তীরে প্রায় ১০,০০০ শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং শিল্প সহায়ক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ সকল শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রকারান্তরে বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নামে ঐ সকল প্রতিষ্ঠানকে বন্ধ করা হলে অথবা উচ্ছেদ করা হলে হঠাৎ করে দেশের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ার সম্ভাবনা যেমন রয়েছে তেমনি ২০৪১ সাল নাগাদ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করার যে স্বপ্ন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেখছেন এবং দেশবাসীকে অনুপ্রাণিত করেছেন যে স্বপ্নটিও ভেঙ্গে যাবার সম্ভাবনাও রয়েছে।
বাস্তবতার নিরীখে যে সকল শিল্প উদ্যোক্তাগণ নদীর তীরে তাদের শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন তারা সকলেই (অবৈধ স্থাপনা ব্যতিত) সরকার থেকে ভূমি বরাদ্দ/দীর্ঘ মেয়াদী লীজ (৯৯ বছর) নিয়ে অথবা ক্রয় মূলে জমির মালিক হয়েছেন। কোন কোন ক্ষেত্রে সরকার দরপত্রের মাধ্যমে ঐ সকল জমি সংশ্লিষ্ট মালিকের নিকট বিক্রয় অথবা ৯৯ বছরের লীজ বন্দোবস্ত দিয়েছে। অত:পর জমির মালিকানা গ্রহণের পর শিল্প মালিকগণ বিভিন্ন সংস্থার ছাড়পত্র নিয়ে শিল্প স্থাপনা গড়ে তুলেছেন। এখন প্রায় একশত বছর পূর্বের সিএস খতিয়ান মূলে জমির সীমানা নির্ধারণ করা কোনভাবে আইনসিদ্ধ বা যুক্তিযুক্ত নয়।
উল্লেখ্য, ১৯০০-১৯২০ এর মধ্যে সকল ভূমি সিএস খতিয়ান ভূক্ত হয়। অপরপক্ষে ১৯৪৭-৬০ এর মধ্যে পিএস খতিয়ান তৈরি হয়। ঢাকা বিভাগে আরএস খতিয়ান হয়েছে ১৯৬০-১৯৭০ এর মধ্যে। সারা দেশ বিএস খতিয়ানকে মূল বিবেচনায় নিয়ে আরো অধিকতর যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে অবৈধ স্তাপনা সমূহ সনাক্ত করা যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সকলেই মনে করে।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য করা যেতে পারে যে, আইডব্লিউ সিইজিআইএস এর গবেষণা অনুযায়ী প্রতি ২০/২৫ বছর অন্তর নদীর গতিপথ ডান ও বাম তীরে পরিবর্তিত হয়। যমুনা নদী-ব্রক্ষ্মপুত্র রিভার সিস্টেম কোন কোন জায়গায় ১০/১৫ কিলোমিটার সরে গিয়ে নতুন গতিপথে প্রবাহিত হচ্ছে। পদ্মা নদীসহ অন্যান্য নদীর তীরও এলাকাভেদে ৭/৮ কিলোমিটার শিফট হয়েছে। যা স্যাাটেলাইট ইমেজ পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট প্রমাণিত হবে। সুতারাং সিএস ও আর এস খতিয়ান প্রণয়ণকালীন গতিপথ এখন অনেক সরে গেছে বিধায় এই আলোকে নদী তীরের বৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ যৌক্তিক কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আরো উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জলসীমায় ২০,০০০ এর উপরে কার্গো, তেলবাহী, যাত্রীবাহী সহ নানা ধরণের মৎস জাহাজ চলাচল করে। বিদেশ থেকে সকল ধরণের আমদানী পণ্য চট্টগ্রাম থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌছে দেওয়াই এসকল তেলবাহী ও কার্গোবাহী জাহাজের কাজ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সকল ধরনের মালামাল পৌছানোর জন্য ঐ সকল জাহাজকে কোন না কোন নদী সংলগ্ন স্থাপনা/ওয়্যার হাউজ/জেটি ব্যহারের প্রয়োজন হয়। নদী তীরে অবিস্থিত ঐ সকল স্থাপনা সীমান নির্ধারণ করা হলে অভ্যন্তরীণ জল পথে পরিচালিত ২০,০০০ লাইটার ভেসেল তাদের লোডিং আন লোডিং পয়েন্টসহ পণ্য পরিবহণে তাদের ঠিকানা হারাবে। ফলশ্রুতিতে পণ্য পরিবহণে ব্যপক ধস নামবে বলে সংশ্লিষ্ট সকলে মনে করে।
সকল বিবেচনায় নদীর তীরভূমি রক্ষার্থে বিএস খতিয়ানকে মূল বিবেচনায় নিয়ে সীমানা নির্ধারণ করা হলে অবৈধ স্থাপনা সনাক্ত করা সহজ হবে এবং এতে সরকারের “নদী বাঁচাও দেশ বাঁচাও” কর্মসূচীর ও সফল বাস্তবায়ন করা সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া, এই সকল কারণে দেশে জন দূভোর্গ সহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ সকল পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের অধিকাংশ নদীর পাড়ে হওয়ায় তা বাস্তবায়নে মুখ থুবড়ে পরার আশংকা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*