বিচার ব্যব্যস্থায় ক্যামেরা ট্রায়ালের গুরুত্ব


: ফাতিমা যাহরা আহ্সান রাইসা :
দেশের জনগণের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা আদালতের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কমন ‘ল অন্তর্ভুক্ত দেশ হওয়ায় আমাদের দেশে সাধরণত বিচারকার্য পরিচালিত হয়ে থাকে প্রকাশ্য আদালতে। বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৫(৩) অনুচ্ছেদে বলা আছে, “ফৌজদারী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার লাভের অধিকারী হইবেন।” অতএব, মানুষের এই অধিকার নিশ্চিত করণের জন্য একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ বিচারব্যবস্থা জরুরী। এজন্য বিচার ব্যবস্থা প্রকাশ্য হওয়া অত্যন্ত জরুরী। প্রকাশ্য আদালতে বিচার পাওয়ার বিষয়টিকে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫(৩) এ নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে পাবলিক ট্রায়াল বা প্রকাশ্য আদালতে বিচার ব্যবস্থা ছাড়া ও অন্য আরেক ধরনের বিচার ব্যবস্থা প্রচলিত আছে, যা হলো ক্যামেরা ট্রায়াল বা সিক্রেট ট্রায়াল। ন্যায়বিচার নিশ্চিতে কেবল পাবলিক ট্রায়াল নয়, বিশেষ অবস্থাতে ক্যামেরা ট্রায়াল ও আবশ্যক। ক্যামেরা ট্রায়াল একটি আইনী শব্দ যার অর্থ ‘গোপনে’। এটি এমন একটি বিচার ব্যবস্থা, যেখানে সাধারণ মানুষ বা গণমাধ্যমের প্রবেশ নিষিদ্ধ। পাবলিক ট্রায়ালের মতো ক্যামেরা ট্রায়ালে উভয় পক্ষ, তাদের সাক্ষী জনসম্মুখে জবানবন্দি প্রদান করেন না। এখানে আইনজীবীরা ও প্রকাশ্যে যুক্তিতর্ক করেন না। অতএব, ক্যামেরা ট্রায়ালে পুরো বিচারকার্য সম্পন্ন হবে উভয় পক্ষ (আসামী ও অভিযুক্ত) ও তাদের সাক্ষী এবং আইনজীবীদের উপস্থিতিতে। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, সংবিধান যেহেতু পাবলিক ট্রায়ালকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে তাহলে ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে বিচার কার্য সম্পাদন করলে কি মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হবে? এই প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই ‘না’ হবে। কারণ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫(৬) এ উল্লেখিত আছে, “প্রচলিত আইনে নির্দিষ্ট কোন দন্ড বা বিচার পদ্ধতি সম্পর্কিত কোন বিধানের প্রয়োগকে এই অনুচ্ছেদের (৩) বা (৫) দফায় কোন কিছুই প্রভাবিত করবে না।” তাই কোন আইনে যদি ক্যামেরা ট্রায়ালের বিষয়টি উল্লেখ থাকে সেটি সংবিধানের স্বীকৃত মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হবে না। বাংলাদেশে বিভিন্ন আইনে, ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ক্যামেরা ট্রায়াল এর মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থার পরিচালনার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০- (সংশোধিত ২০০৩) এ ধর্ষনের মামলা গুলো পরিচালনার ক্ষেত্রে ক্যামেরা ট্রায়ালের কথা বলা হয়েছে। উক্ত আইনের ধারা ২০(৬) এ বলা আছে, “কোন ব্যক্তির আবেদনের প্রেক্ষিতে কিংবা ট্রাইবুনাল স্বীয় বিবেচনায় উপযুক্ত মনে করিলে এই আইনের ধারা ৯ এর অধীনে অপরাধের বিচার কার্যক্রম রুদ্ধদ্বার কক্ষে অনুষ্ঠিত করিতে পারিবে। একটি ধর্ষনের মামলায়, ঢাকা আদালত ভিকটিম ছাত্রীর (ভিকারুন্নিসা নুন স্কুল এন্ড কলেজ) জবানবন্দি নেওয়ার জন্য আদেশ দেন নিজস্ব কক্ষে (ক্যামেরা ট্রায়াল) যে কি না তার শিক্ষক পরিমল জয়ধর দ্বারা যৌন হয়রানীর শিকার হয়েছিল। ভিকটিমের আইনজীবী পিটিশনে উল্লেখ করেন যে, “সে একজন ছাত্রী এবং আদালত প্রাঙ্গনে উত্থাপিত প্রশ্নসমূহ তাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে পারে ফলে জেরা ও জবানবন্দি এর জন্য ক্যামেরা ট্রায়াল আবশ্যক। ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের উক্ত ধারাটি নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী একটি পদক্ষেপ। তবে বাস্তবতা সম্পূর্ণভাবে এখানো ক্যামেরা ট্রায়ালের অনুকূলে নয়। কারণ বিচার ব্যবস্থায়, প্রয়োজনে এবং বিশেষ অবস্থায় যে গোপনীয়তা রক্ষা করা কতটা জরুরী এটি এখনো অনেকের উপলদ্ধির বাইরে। একজন ধর্ষিতা নারীর জবানবন্দি জনসম্মুখে নেওয়া তাকে দ্বিতীয়বার ধর্ষণ করার শামিল। ধর্ষণ মামলা গুলোর ক্ষেত্রে প্রতিটি বিষয়ের খুটিঁনাটি বর্ণনা দিতে হয়। ধর্ষিতা নারীর জন্য জনসম্মুখে প্রতিটি বিষয় এভাবে তুলে ধরা অসম্মানজনক। আসামী পক্ষের আইনজীবী জেরা করার সময় ভিক্টিম বিব্রতকর অবস্থায় পরতে পারে। উম্মুক্ত আদালতের পরিবেশ তাকে মানসিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কারণ দেখা যায়, ধর্ষনের মামলা গুলোর ক্ষেত্রে উৎসুক জনগন আদালত প্রাঙ্গনে এসে ভিড় জমায় এবং ধর্ষন সংঘঠিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে । এতে ভিকটিমকে জেরা জবাববন্দী প্রকাশ্যে করা তার জন্য বিব্রতকর । এভাবে ন্যায়বিচার প্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত হয়। এক্ষেত্রে ক্যামেরা ট্রায়াল ভিক্টিমদের নির্বিঘেœ জজের খাস কামরায় জবানবন্দি দেওয়া সহজ করে দেয়। এছাড়া ও পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ তে ক্যামেরা ট্রায়ালের বিষয়টি উল্লেখ করা আছে। উক্ত আইনের ধারা ১১ তে নিভৃত কক্ষে বিচারের বিষয়টি আছে। (১) পারিবারিক আদালত যথার্থ মনে করিলে এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী সম্পূর্ণ বা আংশিক কার্যক্রম রুদ্ধকক্ষে অনুষ্ঠান করিতে পারেন। (২) যদি মোকদ্দমার উভয় পক্ষ কার্যধারা রুদ্ধকক্ষে অনুষ্ঠানের জন্য আদালতকে অনুরোধ করেন তবে আদালত অবশ্যই অনুরূপ করিবেন। বৈবাহিক সর্ম্পক সংক্রান্ত মামলাগুলোতে যেমনঃ দাম্পত্য সর্ম্পক পুনরুদ্ধার, তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদে, স্বামী-স্ত্রীর পারিবারিক এবং ব্যক্তিগত বিষয়গুলো থাকে। মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন ১৯৩৯ অনুযায়ী বিবাহ বিচ্ছেদ ও ডিক্রির কারণগুলো পুরুষত্বহীনতা, অপ্রকৃতিস্থ, নিষ্ঠুর আচরণ ইত্যাদি। আর এই বিষয়গুলো সরাসরি ব্যক্তির বা পক্ষদ্বয়ের মর্যাদার সাথে জড়িত। কারণ উক্ত বিষয়গুলো বৈবাহিক জীবনের গোপনীয়তা প্রকাশ করে যা দম্পত্তির জন্য অসম্মানজনক। এছাড়া ও পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ ধারা ২৩ এ নিভৃত কক্ষে বিচার কার্যক্রমের বিষয়টি উল্লেখ করা আছে। উক্ত ধারায় বলা আছে “সংশ্লিষ্ট পক্ষগণের সম্মতির ভিত্তিতে অথবা আদালত স্বীয় বিবেচনায় উপযুক্ত মনে করিলে, এই আইনের অধীন বিচার কার্যক্রম রুদ্ধদ্বার কক্ষে করিতে পারিবে।” এছাড়া ও আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন ১৯৭৩ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল রুলস অফ প্রসিডিউর ২০১০ বিচারকার্য ক্যামেরা ট্রায়ালে পরিচালনায় উৎসাহিত করে। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন ১৯৭৩ এর ধারা- ১০, উপধারা- ৪ এ বলা আছে, “আদালত যথার্থ মনে করিলে বিচার কার্যক্রম প্রকাশ্য আদালতের পরিবর্তে ক্যামেরা ট্রায়ালে করতে পারে।” এছাড়া ও উক্ত আইনের ধারা ১১ উপধারা ৪ ট্রাইবুনালকে ক্ষমতা প্রদান করে এমন কোন ব্যক্তি শাস্তি প্রদান করার যে এটির প্রক্রিয়াকে লঙ্ঘন এবং অমান্য করে। এক্ষেত্রে ১০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা ৫ বছরের কারাদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারে। ধারা ৫৮ (ক) ঝঁন-ধৎঃরপষব এ গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টি অর্থাৎ ধারা ১০(৪) অনুযায়ী ক্যামেরা ট্রায়ালে বিচার প্রক্রিয়া সম্পাদনের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং এটি লঙ্ঘন করলে ধারা ১১(৪) অনুযায়ী শাস্তির আওতায় আনা হবে। এছাড়া ও আদালতের যর্থাথ মনে হলে জাতীয় নিরাপত্তার জড়িত এমন বিষয়গুলোর বিচার কার্য ক্যামেরা ট্রায়ালে পরিচালনা করতে পারে। বর্তমানে রাষ্ট্রগুলোকে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদের মতো বিষয়গুলো নিয়ে মামলা পরিচালনা করতে হচ্ছে এবং সেক্ষেত্রে প্রকাশ্য আদালত নিরাপত্তায় বিঘœ ঘটাতে পারে। প্রকাশ্য আদালতে বিচার জনসম্মুক্ষে নিঃসন্দেহে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে। এটিকে বলা হয় মৌলিক অধিকার। যেটি ব্যক্তিস্বাধীনতা নিশ্চিত করে এবং জনগণ ও গণমাধ্যমকে কোর্টে কী চলছে তা পরিষ্কার করে দেয়। এটি ব্রিটিশ আইনের একটি নীতি যা ১২১৫ সালের ম্যাগনা কার্টা স্বাক্ষরের পূর্বে প্রতিষ্ঠিত। প্রকাশ্য আদালত বহুল প্রচলিত একটি বিচার ব্যবস্থা যেখানে সাধারণ জনগণের আদালতের কার্যক্রম এবং রায়ের উপর আস্থা সৃষ্টি হয়। তবু ও ব্যক্তির গোপনীয়তা রক্ষার্থে ক্যামেরা ট্রায়াল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকাশ্য আদালতের বিপরীত এই বিচার ব্যবস্থা প্রাইভেসী রাইটস রক্ষার্থে অত্যন্ত উপযোগী। যৌন হয়রানী, শিশুরা যে মামলায় ভিক্টিম বা অপরাধী বা যে মামলাগুলোতে কিশোর-কিশোরীরা জড়িত সে মামলাগুলোতে গোপনীয়তা রক্ষা অত্যন্ত জরুরী। কারণ জনসাধারণের উপস্থিতি পক্ষদ্বয়কে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারে । ‘রাইট টু প্রাইভেসীর’ বিষয়টি জাতিসংঘের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষনা পত্রের ধারা ১২ তে উল্লেখিত আছে। যেখানে বলা আছে, কারো ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কিংবা তার গৃহ, পরিবার ও চিঠিপত্রের ব্যাপারে খেয়ালখুশিতে হস্তক্ষেপ কিংবা তার সুনাম ও সম্মানের উপর আঘাত করা চলবে না। এ ধরনের আঘাত বা হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার প্রত্যেকরই আছে। এছাড়া ও আইসিসিপিআর এর ধারা ১৭ ও “রাইট টু প্রাইভেসী” উল্লেখিত আছে’। অতএব, এ বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কার যে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিতকরণে, জনগণের ও ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিতে ও সমাজে বিশৃঙ্খলা নিরসনে ক্যামেরা ট্রায়ালের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকাশ্য আদালতে ভিকটিমের সম্ভ্রমহানী ও সাক্ষীর জীবনের ঝুঁকি থাকে তাই ব্যক্তি স্বাধীনতা ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ক্যামেরা ট্রায়ালের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন এবং তা প্রয়োগ করা অত্যন্ত জরুরী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*