এক বছরে ৯ হাজার সিজারিয়ান চট্টগ্রামে

স্টাফ রিপোর্টার :: হাটহাজারীর বাসিন্দা সন্তানসম্ভবা শামসুন নাহার চলতি বছর ২১ জানুয়ারি রাতে নগরের পাঁচলাইশ এলাকায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসকরা বাচ্চার পজিশন দেখে তার অস্ত্রোপচার বা সি-সেকশন লাগবে বলে জানিয়ে দেন। পরে সেখান থেকে শামসুন নাহারকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। এরপর নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে তিনি একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দেন।
শামসুন নাহারে স্বামী বাবুল আহমেদ বলেন, গর্ভাবস্থায় আমার স্ত্রীকে যে চিকিৎসক চেকআপ করেছেন তিনি বাচ্চার পজিশন ভালো বলে জানান। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালে নেয়ার পর তারা জানায়, অস্ত্রোপচার লাগবে। পরে চমেক হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারিতে বাচ্চা হয়।
জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অস্ত্রোপচার বা সি-সেকশনের (সিজারিয়ান) মাধ্যমে ২০১৮ সালে চট্টগ্রামে ৯ হাজার ২৭৯ জন নবজাতকের জন্ম হয়েছে। বিপরীতে ২৪ হাজার ৬১১ জন নবজাতক নরমাল ডেলিভারিতে জন্ম নিয়েছে।
তবে এ সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, ভ্রাম্যমাণ অনেকে তালিকার বাইরে। এ ছাড়া অনেক প্রসূতির তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। ফলে সিজারের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
এদিকে ২০১৭ সালে চট্টগ্রামে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ৯ হাজার ৬৩০ জন ও নরমাল ডেলিভারিতে ২৫ হাজার ২৭০ জন নবজাতকের জন্ম হয়। ২০১৬ সালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ১১ হাজার ২৯৯ জন নবজাতকের জন্ম হয়। একই বছর নরমাল ডেলিভারিতে জন্ম হয় ২৮ হাজার ৬ জন শিশুর।
সম্প্রতি প্রকাশিত আন্তর্জাতিক এনজিও সেভ দ্য চিলড্রেনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে সিজারিয়ান ৫১ শতাংশ বেড়েছে। তার আগে ২০০৪ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে এই অস্ত্রোপচার বেড়ে দাঁড়ায় ৪ থেকে ৩১ শতাংশে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সিজারের কারণে মা ও সন্তান দুজনেই দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগের মুখে পড়ছে।
তারা জানিয়েছেন, গর্ভাবস্থায় মায়ের পর্যাপ্ত পরিমাণ যত্ন না নেয়ার কারণে বাচ্চার পজিশন ঠিক থাকে না। ফলে ঝুঁকি এড়াতে সিজার ছাড়া উপায় থাকে না। নরমাল ডেলিভারিতে নবজাতক এবং মায়ের মৃত্যুঝুঁকি বেশি থাকে বিধায় সিজার বেছে নেন অনেকে। এ ছাড়া সিজার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ ক্লিনিক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যও, টাকার লোভে তারা এ কাজটি করে। পাশাপাশি প্রসবকালীন বেদনা এড়াতে অনেক নারী সিজারের ঝুঁকি নেন।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি ও প্রসূতি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক শাহেনারা চৌধুরী বলেন, সিজারে সন্তান জন্ম দেয়া একজন মা জীবনের বাকী সময় নানা জটিলতায় ভুগেন। পাশাপাশি সন্তানও নানা রোগের হুমকিতে থাকে।
তিনি আরও বলেন, একবার সিজার করালে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরবর্তী সন্তান জন্ম দেয়ার সময় সিজার করাতে হয়৷ এক্ষেত্রে তিনবারের বেশি সিজার করানো সম্ভব নয়।
‘সিজারের ফলে প্রসূতির জরায়ুতে ইনফেকশন হতে পারে৷ পেটের মধ্যে নানা ধরনের জটিলতা হয়ে পরবর্তীতে মাসিকের সমস্যাও হতে পারে৷’
সামাজিক সংগঠন ইলমা’র প্রধান নির্বাহী ও নারী নেত্রী জেসমিন সুলতানা পারু বাংলানিউজকে বলেন, নরমাল ডেলিভারির জন্য অনেক চিকিৎসক প্রসূতিদের কাউন্সেলিং করেন না। তারা বরং কম সময়ে বেশি টাকা উপার্জনের জন্য অপারেশনে উৎসাহিত করেন। যা পেশার নৈতিকতার পুরোপুরি বিপরীত।
‘শুধু চিকিৎসকদের নীতিবান হলে হবে না। অনেক নারী আছেন, যারা ব্যথার ভয়ে সিজার বেছে নেন। তাদেরও এ পথ ছাড়তে হবে। তবে ঝুঁকি থাকলে সেক্ষেত্রে ভিন্ন কথা।’
সিজার বাড়ার কারণ কী পার্টোগ্রাফ?
সন্তান জন্মদানের আগে জরায়ুর মুখ খুলতে শুরু করলে প্রসূতির হার্টবিট, রক্তচাপ, শিশুর অবস্থানের রেকর্ড রাখার পদ্ধতিকে পার্টোগ্রাফ বলা হয়। মূলত লেবার রুমে নেয়ার পর এ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এর মাধ্যমে জানা যায়, প্রসূতির সিজারের প্রয়োজন হবে কিনা।
কিন্তু চট্টগ্রামে পার্টোগ্রাফ পদ্ধতি অনুসরণের হার খুবই কম। চলতি বছরের মার্চ মাসে শুধুমাত্র ৪৬৭ জন প্রসূতির ক্ষেত্রে পার্টোগ্রাফ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে অধ্যাপক শাহেনারা চৌধুরী বলেন, পার্টোগ্রাফ পদ্ধতি অনুসরণ করলে প্রসূতির সিজার নাকি নরমাল ডেলিভারি প্রয়োজন সেটি জানা যায়।
‘কিন্তু চট্টগ্রামের হাসপাতালগুলোতে এ পদ্ধতি খুব একটা ব্যবহার করা হয় না। হাতেগোনা কয়েকটি সরকারি হাসপাতালে ব্যবহার থাকলেও বেসরকারিতে তেমন নেই। তাই সিজারিয়ান বাড়ার এটিও একটি কারণ।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*