শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন

আমি দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করি শিক্ষাঙ্গন হচ্ছে জ্ঞান চর্চার সর্বোৎকৃষ্ট অঙ্গন। এই অঙ্গন গড়ে তোলে জাতির ভবিষ্যৎ স্বপ্ন ও সম্ভাবনা। পৃথিবীর যে কোন দেশে বড় সামাজিক দায়িত্বপালন করে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। জাতির আশা আকাঙ্খার প্রতিফলক এই শিক্ষাঙ্গন যোগ্য নাগরিক উপহার দিয়ে থাকে। কিন্তু দুঃখজনক হলে অপ্রিয় সত্য যে, কিছু কুচক্রিলোকদের কবলে শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদন্ড ভেঙ্গে যাচ্ছে। পবিত্র শিক্ষাঙ্গনে আজ শিক্ষার্থী কতটুকু নিরাপদে ? শিক্ষকের কারণেই যদি শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হয় তখন এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কিছু হতে পারে না। বিভিন্ন ধরণের সামাজিক কুসংস্কার কাটিয়ে নারীরা এগিয়ে আসছে মানুষের ভূমিকায়, আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে। কিন্তু তাদের অগ্রযাত্রায় যৌন নিপীড়ন ও ইভটিজিং বিশাল প্রতিবন্ধকতার ভূমিকা পালন করছে যা নারী শিক্ষা ও তাদের জীবন যাত্রায় প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নারী নির্যাতনের সংখ্যা দ্রুত হারে যেন বেড়ে যাচ্ছে। আগামীতে সেই নির্যাতনের সংখ্যা কোথায় দিয়ে দাঁড়াতে পারে তা সচেতন মহল একটু ভাববেন বলে আশা করি। সভ্যতার এই চরম উৎকর্ষতায় এসে বাংলাদেশের মত একটি উন্নয়নশীল দেশের নারীরা প্রতিদিনই নির্যাতিত হচ্ছে। সাধারনত আমাদের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রত্যেক নারী পুরুষের স্বাধীনভাবে চলা ফেরা করা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। নারী শিক্ষার বিষয়টি আমাদের সামাজিক অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে অপরিহার্য বিষয় হিসেবে জড়িত। আধুনিক সমাজে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেরই মৌলিক অধিকার সমান ও অভিন্ন। একুশ শতকে পদার্পন করে বর্তমান বিশ্ব যে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক পালাবদলে অংশ নিচ্ছে নারী সেখানে এক অপরিহার্য অংশীদার, জীবন যুদ্ধেও অন্যতম শরীক ও সাথী। এককালে মাতৃতান্ত্রিক সামাজে নারীরা ছিল প্রধান্য। পরবর্তী কালে সমাজে পুরুষের প্রধান্য প্রতিষ্টিত হলে নারী হয়ে পড়ে অন্তপুরবাসী। আধুনিক কালে নারীর স্বতন্ত্র মানবিক ভূমিকা স্বীকৃত হয় পাশ্চাত্যে। ভারতে ইংরেজ শাসন শুরু হলে উপমহাদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষার হাওয়া লাগে। যে হাওয়ায় নারী আবার শিক্ষার অঙ্গনে আসার সুযোগ পায়। ইউরোপীয় জীবন ব্যবস্থায় নারী পুরুষের সমমর্যাদা হিসেবে অবাধ মুক্ত জীবনছন্দ এদেশের নবজাগ্রত বুদ্ধিজীবী মানসে ডেউ তোলে নারী প্রগতির ভাবপ্রবাহের। এঙ্গেলস তাঁর ‘‘অরিজিন অব দ্য ফ্যামিলি’ গন্থে বলেছেন, ‘‘নারী মুক্তি তখনই সম্ভব যখন নারীরা সমাজের প্রতিটি কর্মকান্ডে সমগুরুত্ব নিয়ে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে’’। আর নারীকে মুক্তি দেওয়ার জন্যে, নারীর উন্নয়নের জন্যে, এক কথায় নারীর ক্ষমতায়নের জন্যে দরকার সব ধরনের প্রতিবন্ধকতার অবসান। প্রয়োজন শিক্ষার প্রসার ও সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি। বর্তমান সভ্য সমাজে শিক্ষা ছাড়া সবই অচল। তাছাড়া কোনো স্বাধীন জাতির পক্ষে নিরক্ষর ও মূর্খ থাকা এবং বিশ্বজগৎ, জীবন ও পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে অজ্ঞান থাকা জাতীয় মর্যাদার পক্ষে হানিকর। আর সেই শিক্ষা লাভ করতে গিয়ে বাংলাদেশের নারী সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পথে বাঁধা দূর হয়নি। যদিওবা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতীয় জীবনে নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়, গণতান্ত্রিক চেতনার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে এবং সমাজে নারী পুরুষের সমান মৌলিক অধিকার স্বীকৃতি পায়। শিক্ষা মানুষকে বাঁচতে শেখায়। অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আলোকিত মানুষ গড়ার কারখানা আর শিক্ষকরা হচ্ছেন মানুষ গড়ার কারিগর। কিন্তু সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেন যৌন নিপীড়নের মত ঘটনা ? আসলে সংলাপগুলো একদিক দিয়ে লজ্জাকর অন্যদিক দিয়ে বেদনাদায়ক। পবিত্র শিক্ষাঙ্গন গুলো অপবিত্র করতে যাচ্ছে এক শ্রেণীর নিপীড়ক, কিছু কুচক্রিলোক। যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, মহান এ পেশায় কিছু কুলাঙ্গার ঢুকে পড়েছে, যারা রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নের খরব পত্র-পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে। দেশবাসী এসব সংবাদ দেখে, যা ছিল তাদের অপ্রত্যাশিত এবং অনাকাঙ্খিত। একের পর এক বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নারী নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে চলছে। ছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্ধি দিয়েছিলেন ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষক। এ ঘটনায় ঢাকা মহানগর তৎকালীন হাকিম ফৌজদারী কার্যবিধি’র ১৬৪ ধারায় তার জাবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন। পরে তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে রিমান্ডের সময় শেষ হওয়ার আগেই নিজেই ঘটনা পুলিশের কাছে স্বীকার করে। জবানবন্দিতে বলেন, স্কুলের কাছে বাসা ভাড়া নিয়ে তিনি ছাত্রী পড়ানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। ধর্ষিত ছাত্রীটি তার কাছে পড়তে শুরু করে। একদিন মেয়েটি একা পড়তে আসে, তিনি মেয়েটিকে অপেক্ষা করতে বলে অন্য মেয়েদের চলে যেতে বলে। এরপর মেয়েটিকে ধর্ষন করে। সম্প্রতি নুসরাত এর ঘটনা। নুসরাত এক করুণ শোকের নাম হয়ে থাকবে। মাদ্রাসার সেই অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তার এই পরিণতি। একজন শিক্ষকের যৌন সন্ত্রাসের প্রতিবাদ করে জীবন দিতে হলো তাকে। বর্ণিত এই ধরণের শিক্ষককে কি সত্যিই মানুষ গড়ার কারিগর বলা যায় ? প্রতিবছর কোননা কোন শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষা গ্রহণে যাওয়া ছাত্রী ধর্ষিতা হয়ে, যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে ফিরে আসছে। অথচ এদের কাছ থেকে পরিবার যেমন অনেক কিছু আশা করে তেমনি জাতিও অনেক কিছু আশা করে থাকে। কিন্তু সেই স্বপ্নকে চিরতরে ধ্বংস করে দিচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনকে এদের কবল থেকে মুক্ত করে শিক্ষা এবং জাতির মেরুদন্ডকে শক্তিশালী করা আবশ্যক। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক যে কোন আইনে নারীর ওপর অত্যাচারের বিচার করা সরকারের দায়িত্ব। সিডো সনদের ১ অনুচ্ছেদের ৬ ধারায় বলা হয়েছে, ‘‘শরিক রাষ্ট্রগুলো নারীকে সব ধরণের অবৈধ ব্যবসায় এবং দেহ ব্যবসায়ের আকারে নারীর শোষণ দমন করার লক্ষে আইন প্রণয়নসহ সব উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে’’। দেশীয় আইনেও এমন অনৈতিক ও মানবতাবিরোধী কাজের বিচার করা অবশ্য কর্তব্য। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৮(২) ও ৩৪(১) অনুযায়ী গণিকাবৃত্তি ও জুয়াখেলা নিরোধের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা নেবে এবং সব ধরনের জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধ ও আইনত দন্ডনীয়। ইভটিজিং দন্ডবিধি ১৮৬০ এর ৫০৯ ধারায় দন্ডনীয় অপরাধ। তাছাড়া সম্প্রতি সরকার সর্বোচ্চ শাস্তি ৭ বছর কারাদণ্ড এবং ৫০,০০০ টাকা জরিমানার বিধান রেখে আইন প্রণয়ন করেছেন এমনকি ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমেও সর্বনিম্ন ১ বছর কারাদণ্ড ও ৫,০০০ টাকা জরিমানার বিধান রেখে অধ্যাদেশ জারী করেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধনী ২০০৩) এর ১০ ধারায় যৌনপীড়ন এর শাস্তি হিসেবে অনধিক ১০ বছর কিন্তু অন্যূন ৩ বছর সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থ দণ্ডও রয়েছে। আর যদি নারীর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে বা অশোভন অঙ্গভঙ্গি করে তাহলে অনধিক ৭ বছর অন্যূন ২ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ড। উক্ত আইনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডেরও বিধান রয়েছে।
আজকাল পত্র পত্রিকার পাতা খুললেই ‘ইভটিজিং এর শিকার বা যৌন নির্যাতনের শিকার’ শিরোনামে নির্মম সংবাদ। এ অমানবিক বিষয়টি মানুষকে অবমূল্যায়ন করছে। বৃদ্ধি করছে সামাজিক সমস্যা, নিয়ে আসছে সমাজ জীবনে অনাকাঙ্খিত বিপুল দুঃখ দুর্দশা। এসব বন্ধে সামাজিক আন্দোলন বা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন ও আধুনিকায়ন করে সঠিক ও যথাযথভাবে প্রয়োগ নিশ্চিত করা। বিচার দ্রুত সম্পন্ন করতে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে। মহানগর পুলিশ অধ্যাদেশকে সংশোধন ও আধুনিকায়ন করে যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি রোধে মহামান্য হাইকোর্টের রায়ের দিক নির্দেশনার অনুকরণে আইন প্রণয়ন করা। ইভটিজিং আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি, সামাজিক সংগঠন, সেচ্ছাসেবক সমিতি ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও পাড়ায় পাড়ায় মহল্লা কমিটি গঠন করে তাদের পাশাপাশি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের যৌথ উদ্যোগে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যৌন হয়রানি, ইভটিজিং ও নারী অবমাননার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। উন্মুক্ত আকাশ সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুষ্ঠু বিনোদন ও খেলাধুলার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে সরকারী ব্যবস্থাপনা পরামর্শকেন্দ্র চালু করা এবং মাঝে মধ্যে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দ্বারা ক্লাশের ব্যবস্থা করা। হত্যা ঘটনাকে আত্মহত্যা মামলা হিসেবে রুজু করার প্রবণতাকে কঠোরভাবে দমন করা। অধিক কর্মক্ষেত্র তৈরী করে বেকারদের কাজের ব্যবস্থা করা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের সময় তার স্বভাব চরিত্র ও বংশ মর্যাদাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের প্রতি বিনীত অনুরোধ আপনারাও যেন ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি এই ব্যাপারে অধিক যত্মবান হউন। শিক্ষকদের দ্বারা যাতে আর কোন ছাত্রী নির্যাতিত না হয়। যেন তাদের নিজের কন্যার মতো আচরন করা হয়। কারণ দিবসের একটি বড় সময় ছাত্র-ছাত্রীরা আপনাদের সাহচর্যে থাকে। বাবা-মার কাছ থেকে যা কিছু শিখে তার চেয়ে অনেক বেশী জ্ঞান অর্জন করে একজন শিক্ষকের নিকট থেকে। সুতরাং তাদের সম্পর্ক যাতে হয় পরম পবিত্র। কিছু সংখ্যক শিক্ষকের কারণে যেন নষ্ট না হয় সমগ্র শিক্ষক জাতির সম্মান ও শ্রদ্ধা। এ ব্যাপারে বিশেষভাবে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*