গণপূর্তে দুর্নীতির ১০ উৎস : দুদক


ঢাকা অফিস::
গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিমের কাছে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক টিমের প্রতিবেদন হস্তান্তর করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার ড. মো. মোজাম্মেল হক খান।
বুধবার (৯ অক্টোবর) সচিবালয়ে হস্তান্তরকালে দুদক কমিশনার মোজাম্মেল হক খান বলেন, সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন, অডিট রিপোর্ট, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনসহ কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক টিমের নিজস্ব মতামতের সমন্বয়ে এ প্রতিবেদনটি প্রণয়ন করা হয়। প্রতিবেদনে ১০টি উৎসে দুর্নীতি ও দুর্নীতি প্রতিরোধে ২০টি সুপারিশ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রাক্কলন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই নিবিড় মনিটরিংয়ের প্রয়োজন। কারণ এসব ক্ষেত্রে দুর্নীতির ব্যাপকতা রয়েছে। এমনকী ইজিপি প্রক্রিয়ায়ও ঠিকাদার-কর্মকর্তার যোগসাজশের ঘটনা ঘটছে। যেসব কর্মকর্তার নৈতিকতার বিষয়ে বিতর্ক রয়েছে তাদের বড় বড় প্রকল্পে নিয়াগ না দেওয়াই সমীচীন।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত কমিশনের এ উদ্যোগ স্বাগত জানিয়ে বলেন, কমিশনের এ প্রতিবেদন আমাদের গাইডলাইন দেবে- যা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে কাজ করবে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতার নীতি অনুসরণ করছেন। আমি তার মন্ত্রিসভার একজন সদস্য হিসেবে দুর্নীতিকে ন্যূনতম সহ্য করবো না। আমি তার এই নীতিকে শতভাগ ধারণ করি এবং তা বাস্তবায়নের জন্য নিবেদিত থাকবো।
দুর্নীতির ১০ উৎসঃ-
১. টেন্ডার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি: অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রাক্কলন, টেন্ডারের তথ্য ফাঁস, নেগোসিয়েশনের নামে অনৈতিক সুবিধায় সাপোর্টিং বা এজেন্ট ঠিকাদার নিয়োগ, বারবার নির্মাণকাজের ডিজাইন পরিবর্তন, নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার, টেন্ডারের শর্তানুসারে কাজ বুঝে না নেওয়া, মেরামত বা সংস্কার কাজের নামে ভুয়া বিল ভাউচার করে অর্থ আত্মসাৎ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী ব্যক্তি বেনামে অথবা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনদের মাধ্যমে ঠিকাদারি কাজ পরিচালনা, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ এবং ঠিকাদার ও প্রকল্প বাস্তবায়নের সহিত সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর অনৈতিক সুবিধা লাভ দুর্নীতির উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
যথাযথ প্রক্রিয়ায় টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করা, অপছন্দের ঠিকাদারকে নন রেসপনসিভ করা, অস্বাভাবিক মূল্যে প্রাক্কলন তৈরি, ছোট ছোট প্যাকেজে প্রকল্প প্রণয়ন, টেন্ডারের শর্তানুসারে কাজ বাস্তবায়ন না করা।
২. নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার: গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাধ্যমে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্প বা নির্মাণকাজে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী যেমন- নিম্নমানের ইট, রড, সিমেন্ট ও বালু ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে যে অনুপাতে সিমেন্ট বালি মেশানোর কথা তা না করে বালির পরিমাণ বেশি মেশানো হয়। এছাড়া যে পরিমাণ রড দেওয়ার কথা তা না করে তার থেকে কম রড এবং যে ঘনত্বে দেওয়ার কথা তা না করে রডের পরিমাণ কম দেওয়া হয়। এর সঙ্গে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদার জড়িত থাকেন মর্মে জনশ্রুতি রয়েছে।
৩. প্রকল্প প্রণয়ন, তদারকি, বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কাজে ধীরগতি: সরকারের ভবন নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পরিধি বহুগুণ বেড়েছে। নির্মাণকাজের ব্যাপকতা ও কলেবর বৃদ্ধির তুলনায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের জনবলের আকার আনুপাতিক হারে বাড়েনি। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়োজিত গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রয়োজনের তুলনায় জনবল আনুপাতিক হারে কম থাকায় প্রকল্প প্রণয়ন, তদারকি, বাস্তবায়নে পরিবীক্ষণ কাজে ধীরগতির অভিযোগ রয়েছে।
৪. প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দ কম: গণপূর্ত অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত ভবনের মেরামত, সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য যে পরিমাণ বরাদ্দ প্রয়োজন তার এক তৃতীয়াংশ পাওয়া যায় না। যথাসময়ে বরাদ্দ ছাড়ের অভাবে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ বিঘ্নিত হয়। যার ফলে রক্ষণাবেক্ষণ কাজ চাহিদা মাফিক করা সম্ভব হয় না।
৫. অনাবশ্যক প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি: প্রকল্প ছক সংশোধন করে অনাবশ্যক প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো হয়। মূলত আর্থিক মুনাফার প্রত্যাশায় প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও ঠিকাদার ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ব্যয় বাড়ে।
৬. স্থাপত্য ও কাঠামোগত নকশা চূড়ান্তকরণে বিলম্ব: পর্যাপ্ত লোকবলের অভাবে স্থাপত্য অধিদপ্তর প্রায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নকশা সরবরাহ করতে সক্ষম হয় না। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়।
৭. প্রত্যাশী সংস্থার প্রয়োজনমতো জরুরিভিত্তিতে কার্য সম্পাদন না করা: গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের অবহেলা, সদিচ্ছা ও মনিটরিংয়ের অভাবে প্রাক্কলন তৈরি থেকে শুরু করে টেন্ডার আহ্বান কার্যাদেশ ও কাজ সমাপ্তিপ্রত্যাশী সংস্থার চাহিদামতো জরুরি ভিত্তিতে সম্পাদন করা হয় না।
৮. সেবার বিভিন্ন স্তরে কর্মকর্তা কর্মচারীদের অসহযোগিতা: গণপূর্ত অধিদপ্তরের আওতাধীন বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, অধিদপ্তর বা সরকারি কোয়ার্টারের মেরামত রক্ষণাবেক্ষণসহ সেবা দেওয়ার বিভিন্ন স্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অসহযোগিতা। ফলে সেবাপ্রত্যাশীরা সময়মতো প্রত্যাশিত সেবা থেকে বঞ্চিত হন।
৯. সময়মতো ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ না করা: অনেক সময় কাজ শেষে ঠিকাদার বিল দাখিল করলেও প্রকল্প কর্মকর্তা নানা অজুহাত দেখিয়ে বিল আটকিয়ে রাখেন। এক্ষেত্রে যে সব ঠিকাদারের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতা হয় সে সব ঠিকাদারের বিল আগে পরিশোধ করা হয় মর্মে অভিযোগ রয়েছে।
১০. বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও ঠিকাদারদের আংশিক বিল পরিশোধ করা: অনেক ক্ষেত্রে বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও ঠিকাদারদের আংশিক বিল পরিশোধ করা হয়। এক্ষেত্রেও যে সব ঠিকাদারের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতা হয় সে সব ঠিকাদারের বিল আংশিক পরিশোধ না করে পুরো বিল পরিশোধ করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*