বন্দরে উড়োচিঠির ভিত্তিতে দুদকের তদন্তের ঘটনায় অতি উৎসাহী মিডিয়া কর্মীর অপতৎপরতা


আবুহেনা খোকন ::
চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির এক উড়োচিঠির ভিত্তিতে তদন্তকে ঘীরে একশ্রেণীর অতিউৎসাহী সংবাদকর্মীদের মিথ্যা প্রচারণায় জনমনে ও বন্দর ব্যবহারকারীদের মাঝে ক্ষোভের অন্ত নেই। গণমাধ্যমে উড়োচিঠির সাধারণ তদন্তের বিষয়টিকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রচারণায় হতাশা প্রকাশ করেছেন বন্দর সংশ্লিষ্টরা। দুদক নিয়মিত নানা বিষয়ে তদন্ত করে। তবে বেনামী উড়োচিঠির তদন্ত নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে মিথ্যা প্রচারণায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর কেন্দ্রিক কিছু মাফিয়া ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান হলুদ সাংবাদিকদের ব্যবহার করে বন্দরে কর্মরত সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র শুরু করেছে । এক সময়ে রাজনৈতিক নেতা কিংবা অমুক ভাইয়ের তমুক পরিচয়ে যারা চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কোটি কোটি টাকার টেন্ডার বাগিয়ে মাফিয়া বনেছে তাদের চক্ষুশুল হয়ে উঠেছে সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তারা। মাফিয়াদের এই চক্রান্ত বন্দর ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নয় এই চক্রান্ত দেশ ও দেশের অর্থনীতির বিরুদ্ধে বলে অবহিত করছেন বিশ্লেষকগণ। এই ব্যাপারে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তাঁরা। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের একটি আঞ্চলিক পত্রিকা ও একটি অনলাইন পোর্টালে ” দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার খোঁজে বন্দরে দুদক ” ‘ঘুষের বিনিময়ে ঠিকাদারদের তথ্য দেন প্রকৌশলীরা” ” শত কোটি টাকার ঘুষ লেনদেনে অভিযুক্ত বন্দরের তিন কর্মকর্তা” পৃথক শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান নগরীর সচেতন মহল , বন্দর কর্মকর্তারা ও বন্দর ব্যবহারকারীগণ। তাঁরা এই ষড়যন্ত্রমূলক প্রকাশিত সংবাদের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ষড়যন্ত্রকারী মাফিয়ারা তারিখবিহীন “নর্দার্ন লাইটস” নামক একটি প্রতিষ্ঠানের প্যাড ব্যবহার করে প্রোপাইটরের দস্তখত জালিয়াতি করে দুর্নীতি দমন কমিশন বরাবরে বন্দরের (ডেপুটি কনজারভেটর) ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলম, মেইন ওয়ার্কশপের নির্বাহী প্রকৌশলী আসিফ মাহমুদ ও নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে একটি ভুয়া দরখাস্ত দেন। ভুয়া এই দরখাস্তের সূত্র ধরে ১৮ ফেব্রুয়ারি দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ বন্দরে অনুসন্ধানে যায়। দুদকের অনুসন্ধানী দল গোপনে ও প্রকাশ্যে তদন্ত করেন এবং আবেদনে ব্যবহৃত দস্তখতকারীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। এই ব্যাপারে ” নর্দার্ন লাইটস” এর সত্বাধিকারী লেঃ(অবঃ) আহসানের সাথে কথা বললে তিনি জানান, আমার নাম ও প্রতিষ্ঠানের প্যাড ব্যবহার করে কে বা কারা বন্দরের সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দরখাস্ত করেছে। এই খবর আমি অবগত হওয়ার সাথে সাথে আমার প্রতিষ্ঠানের প্যাডে সীলসহ আমার দস্তখত করে দুদক চেয়ারম্যান ও দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ বরাবরে লিখিতভাবে জানিয়ে দিয়েছি । এছাড়া একই দরখাস্ত আমি সমস্ত সংবাদ মাধ্যমেও প্রেরণ করেছি।
আমি এই জালিয়াত চক্রের শাস্তি দাবী করি। এই বিষয়ে বন্দর সচিব ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, এটি একটি উড়োচিঠি এর কোন ভিত্তি নেই। উড়োচিঠি ও হটলাইন ১০৬ এ উড়োফোনের প্রেক্ষিতে দুদক দল এসেছিল বন্দরে। দুদকও বিষয়টি বুঝতে পেরেছে ।
দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ সূত্রে জানা যায়, একটি চিঠি ও ১৭ ফেব্রুয়ারী হটলাইন ১০৬ এ ফোনের প্রেক্ষিতে দুদকের সহকারী পরিচালক জাফর আহমদের নেতৃত্বে একটি এনফোর্সমেন্ট টিম চট্টগ্রাম বন্দরে অনুসন্ধান পরিচালনা করেন। অনুসন্ধানে অনিয়মের কোন তথ্য পাওয়া যায় নি বলে নিশ্চিত করেছেন দুদকের একটি সূত্র। একটি উড়ো চিঠির ভিত্তিতে দুদকের তদন্তকে ভিন্নখাতে প্রভাবিত করতে একশ্রেণীর মিডিয়া কর্মী ভিত্তিহীন সংবাদ ও প্রচারণা চালাচ্ছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রচারণাকারীরা সত্যিকার ঘটনা আড়াল করে সংবাদ প্রচারে সংশ্লিষ্টদের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুন্ন হচ্ছে। বন্দর সংশ্লিষ্টদের এ ব্যাপারে ক্ষোভের অন্ত নেই।
বন্দরের উচ্চপদস্থ কয়েকজন কর্মকর্তা ও বেশ কয়জন বন্দর ব্যবহারকারী জানান, ২০১৪ সালের পর হতে বন্দর নৌ-প্রকৌশল বিভাগের ব্যাপক দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ যড়যন্ত্রকারীরা নৌ-প্রকৌশল বিভাগের দুই দক্ষ, সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই শুরু করেছে ষড়যন্ত্র। নৌ-প্রকৌশল বিভাগে দক্ষতা বৃদ্ধির ফলে বছরে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রায় ৪০ কোটি টাকার সাশ্রয় হচ্ছে । তাঁরা বলেন,
নৌ-প্রকৌশল বিভাগের তিনটি স্লিপওয়ে ও ৯ টি ওয়ার্কশপের মাধ্যমে বন্দরের সমস্ত জলযানের ডকিং ও মেরামত কাজ সম্পন্ন করা হয়। সম্প্রতি বন্দর নৌ-প্রকৌশল বিভাগ বন্দরে ব্যবহারের জন্য নতুন জাহাজ নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা ।

চট্টগ্রাম বন্দরে আগমনকারী জাহাজের সংখ্যা প্রতিবছর শতকরা ১২ ভাগ বৃদ্ধি পাচ্ছে । অথচ সে হারে টাগ এবং লজিস্টিক ক্রাফট বৃদ্ধি পায়নি ‌ বিদ্যমান টাগ এবং ক্রাফট সমূহ সাশ্রয়ী খরচে মেরামত করে বন্দরের অপারেশনাল কাজ সর্বদা সচল রাখা হয়। পূর্বের তুলনায় বন্দরের জলযান রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অর্ধেকের চেয়েও বেশি কমেছে। (ইজিপি) পদ্ধতিতে দরপত্র আহবান করে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে মেরামত কাজ সম্পন্ন করা হয়। কিছু অসাধু ঠিকাদার বিভিন্নভাবে নৌ বিভাগ এবং প্রকৌশল বিভাগে চাপ সৃষ্টি করে কাজ বাগিয়ে নিতে অপারগ হওয়ায় বন্দরের সৎ এবং নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*